ঠাকুরগাঁও মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে সার্জন ও অ্যানাস্থেটিস্টসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসক পদ শূন্য থাকায় এবং দীর্ঘস্থায়ী ওষুধ সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গর্ভবতী মা ও রোগীরা। গত আট মাসেরও বেশি সময় ধরে এই কেন্দ্রে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতি মাসে আউটডোরে আসা প্রায় ৩০০ রোগী প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।
ঠাকুরগাঁও শহরের প্রাণকেন্দ্রে পৌরসভার সামনে অবস্থিত ২০ শয্যার এই কেন্দ্রটি গর্ভবতী মায়েদের স্বাভাবিক ও সিজারিয়ান প্রসব সেবা, শিশু পরিচর্যা, প্রজননতন্ত্রের সংক্রামক ও যৌনবাহিত রোগের চিকিৎসা, কিশোরী সেবা এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিসহ বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক ও এমআর সেবা দিয়ে থাকে।
কেন্দ্রের সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠানের সার্জন চিকিৎসক ডা. হাবিব অবসরে যাওয়ার পর থেকে এই পদটি শূন্য রয়েছে। এর পাশাপাশি অ্যানাস্থেটিস্ট মেডিকেল অফিসার পদটিও দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। ফলে সিজারিয়ান সেবা প্রায় পুরোটাই বন্ধ হয়ে গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অন্তত ২৮০ জনের সিজারজনিত প্রসব করানোর কথা থাকলেও একজনেরও সিজার করা সম্ভব হয়নি। তবে কেন্দ্রটিতে স্বাভাবিক উপায়ে (নরমাল ডেলিভারি) প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ জনের প্রসব করানো হচ্ছে।
সেবা নিতে আসা নার্গুন এলাকার আকলিমা আক্তার বলেন, ‘হামরা গরিব মানুষ, টাকা নাই ওষুধ কিনিবার। তাই এইঠে আইসচি। কিন্তু এইঠেও ওষুধ নাই। এলা হামরা যাবো কোনঠে। ওষুধ কিনার টাকা তো নাই হামার।’
শহরের মুন্সিপাড়া এলাকার নুরজামান বেগম জানান, ‘আমি গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন এখানে সেবা নিতে আসি, নিয়মিত চেকআপ করাই। কিন্তু এখানে সন্তান প্রসব করানো যাবে না। সিজারের জন্য ডাক্তার নেই। তাই বাইরে বেশি টাকা দিয়ে সিজার করাতে হবে আমাকে। এখন টাকা জোগাড় করার চিন্তায় আছি।’
সদর উপজেলার বেগুনবাড়ী ইউনিয়নের জলেখা আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী ভ্যানচালক, আমি গর্ভবতী। দুই মাস পর আমার সিজারের তারিখ আছে। মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে ডাক্তার নেই। আমাকে বাইরে প্রাইভেট ক্লিনিকে সিজার করতে হবে। সেখানে তো অনেক টাকা লাগবে, এত টাকা আমাদের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব না। বাইর থেকে ওষুধ কিনতেই টাকা শেষ। এখন কী করব, সেই চিন্তায় আছি।’
কেন্দ্রের নার্স নাদিরা বেগম বলেন, ‘ঠাকুরগাঁও মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে ক্লিনিকের সার্জন চিকিৎসক ও অ্যানাস্থেটিস্ট মেডিকেল অফিসার পদ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পদগুলো শূন্য থাকায় কাজে ভাটা পড়েছে। তাছাড়া আট মাস ধরে আমরা রোগীদের কোনো ওষুধ দিতে পারছি না।’
ঠাকুরগাঁও পরিবার কল্যাণ সহকারী কর্মকর্তা (এমসিএইচ-এফপি) খালেদা ফাহমি বলেন, ‘নিয়মিত অনেক গর্ভবতী নারী আসেন সেবা নেওয়ার জন্য। আমরা পরামর্শ সেবা দিতে পারি, কিন্তু ওষুধ দিতে পারি না। খুব খারাপ লাগে রোগীদের খালি হাতে ফেরত দিতে। আবার অনেকের সিজারের প্রয়োজন হয়, কিন্তু ডাক্তারের অভাবে আমরা তা পারছি না। চিকিৎসক ও ওষুধ যেন দ্রুত সরবরাহ করা হয়, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।’
মেডিকেল অফিসার ডা. লাবনী বসাক বলেন, ‘গত আট মাস ধরে আমাদের ক্লিনিকে ওষুধসংকট চলছে, পাশাপাশি দুজন চিকিৎসক না থাকায় সিজার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এখানে জেলার গরিব মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন, কিন্তু আমরা প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পারছি না। তবে নরমাল ডেলিভারি প্রতিনিয়ত হচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যে চিকিৎসক ও ওষুধসংকটের কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করছি, যত দ্রুত সম্ভব সমস্যাগুলোর সমাধান হবে।’
ঠাকুরগাঁও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক শামসুদ্দিন মোল্লা চিকিৎসক ও ওষুধসংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা মন্ত্রণালয়ে ওষুধসংকট ও চিকিৎসক চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। কয়েক দিনের মধ্যেই রোগীদের ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি। আর চিকিৎসকের শূন্যপদও অচিরেই পূরণ করা হবে। পদায়ন সম্পন্ন হলেই আগের মতো ওষুধ বিতরণ ও সিজারিয়ান কার্যক্রম পুরোদমে চালু হবে।’