আষাঢ়-শ্রাবণ মাস থেকেই ভোলার নদী ও সাগরে পুরোদমে ইলিশের মৌসুম শুরু হয়। সাধারণত এই সময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে নদীতে তীব্র স্রোত সৃষ্টি হয় এবং সেই স্রোতের বিপরীতে সাগর থেকে মোহনায় উঠে আসে রূপালি ইলিশ। তবে এবার দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। ভরা মৌসুম চললেও ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। অন্যদিকে, ঘন ঘন নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তাল সাগরে যেতে পারছেন না জেলেরা। দিন-রাত জাল ফেলে ব্যর্থ হয়ে ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন দ্বীপ জেলার লক্ষাধিক জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ী।
জেলে ও ট্রলার মালিকদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরু থেকেই নিম্নচাপের কারণে সাগর উত্তাল থাকায় গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে ঘাটে নোঙর করে পড়ে আছে বড় বড় ট্রলার। মাছের দেখা না পাওয়ায় ট্রলারের জ্বালানি খরচ এবং মাঝিমাল্লাদের খোরাকি জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
তুলাতুলি মাছ ঘাট এলাকার জেলে ফারুক মাঝি গত বিশ বছর ধরে মেঘনা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিনি জানান, গত কয়েক বছর ধরে ভরা মৌসুমেও মেঘনা নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা পাচ্ছেন না তিনি, যার ফলে মৌসুমের বাইরে ধারদেনা শোধ করতে গিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন। একই পরিস্থিতি শিবপুরের বয়স্ক জেলে ওদুদ মাঝির। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় তিনি ইঞ্জিনের নৌকার পরিবর্তে দাঁড়ের নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যান। তবে রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজেও ইলিশ না পাওয়ায় আয়ের বদলে কেবল বাড়ছে তার ধারদেনা।
শিবপুর মৎস্য ঘাটের রফিজল মাঝি জানান, ভোলার মেঘনা নদীতে প্রতিদিন দুই বার মাছ ধরতে গেলে জ্বালানি তেলসহ দুই থেকে ৪ হাজার টাকার বাজার লাগে। গত চার মাস ধরে ব্যয় এভাবে বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত মাছ মেলেনি। তিনি বলেন, "এবার ভেবেছিলেন মৌসুম শুরু হলে মাছ পেয়ে ধারদেনা শোধ করবেন, কিন্তু তা আর হলো কই! নদীতে মাছ না পাওয়ায় দেনা বাড়ছে। এখন ‘জাইলা গিরি’ (জেলে পেশা) ছেড়ে দেওয়ার অবস্থা। অন্যদিকে এনজিওর কিস্তির ঋণ বাড়ছে। সেই ঋণ শোধ করার জন্য আবার আরেকজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে।"
নাছির মাঝি ঘাটের জেলে শহীদ মাঝি বলেন, "এ বছর নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে যা মাছ পেয়েছি, তার চেয়ে আমাদের খরচ অনেক বেশি। নদীতে গেলেই আমরা আরও দেনাদার হয়ে পড়ছি। নদীতে কোনো মাছ নেই।"
মৎস্য ব্যবসায়ীরাও এই সংকটে পড়েছেন। তুলাতুলি মাছ ঘাটের ব্যবসায়ী নাছিম জানান, আগে এই ঘাটে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার মাছ কেনাবেচা হতো এবং তারা ঢাকার পার্টিতে (আড়তে) মাছ পাঠাতে পারতেন। কিন্তু বর্তমানে ২ লাখ টাকার মাছও কেনাবেচা হয় না।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নদীর মোহনায় ডুবোচর সৃষ্টির ফলে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণপথ পরিবর্তিত হয়েছে, যা এই সংকটের মূল কারণ।
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হুসাইন জানান, মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর ১৯০ কিলোমিটার অভয়াশ্রমে ছোট-বড় অসংখ্য ডুবোচর জেগে ওঠায় বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল। এর সাথে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট সংকটের কারণে নদীতে ইলিশ সংকট বাড়ছে। তবে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে সামনের সময়ে নদীতে ইলিশের দেখা মিলবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, সারা দেশে ইলিশের ৩৪ শতাংশ চাহিদা পূরণ হয় ভোলা থেকে। চলতি মৌসুমে ভোলায় ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে মৎস্য বিভাগ। জেলায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৭০ জন, তবে এর বাইরেও আরও লক্ষাধিক জেলে এই পেশার সাথে জড়িত।