ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, হত্যা, আত্মহত্যা, যৌন হয়রানি এবং বাল্যবিবাহসহ নারী ও কন্যাশিশুর ওপর প্রায় সব ধরনের সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে কন্যাশিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকলেও প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা সবচেয়ে বেশি হত্যার শিকার হচ্ছেন। বিচারহীনতা, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ এবং সামাজিক দায়মুক্তির সংস্কৃতি এই সহিংসতাকে আরও উসকে দিচ্ছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনটির মতে, নারী নির্যাতন এখন কেবল নারীর সমস্যা নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের সংকটে পরিণত হয়েছে।

সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন চিত্র–২০২৫’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেমের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানে সমীক্ষার তথ্য উপস্থাপন করেন জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কর্মকর্তা আফরুজা আরমান। তিনি জানান, ১৪টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনার ওপর ভিত্তি করে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছে।

সমীক্ষার তথ্যানুযায়ী, কন্যাশিশুরা দলবদ্ধ ধর্ষণ (১৪২টি ঘটনা), আত্মহত্যা (২০৩টি ঘটনা) এবং ধর্ষণচেষ্টার (১১৭টি ঘটনা) ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা হত্যার (৭৫৬টি ঘটনা), ধর্ষণের (৩৭৬টি ঘটনা) এবং যৌন হয়রানির (১২৫টি ঘটনা) ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শৈশবে যৌন সহিংসতার ঝুঁকি বেশি থাকলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হত্যা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গৃহিণীরা হত্যার ৫৮ শতাংশ, আত্মহত্যার ৬৩ শতাংশ এবং যৌতুক–সংক্রান্ত সহিংসতার ৯৪ শতাংশ ঘটনার শিকার। অন্যদিকে শিক্ষার্থী কন্যাশিশুরা ধর্ষণের চেষ্টা (৮০ শতাংশ), আত্মহত্যা (৬৭ শতাংশ), দলবদ্ধ ধর্ষণ (৩৯ শতাংশ) এবং বাল্যবিবাহের (১০০ শতাংশ) ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, নারী ও কন্যাশিশুর জন্য ঘর এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—উভয় স্থানই ক্রমে অনিরাপদ হয়ে উঠছে।

অপরাধীদের দায়মুক্তির প্রধান কারণ হিসেবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষ্য-প্রমাণের দুর্বলতা এবং ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার সামাজিক প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছে সমীক্ষাটি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, জবাবদিহি নিশ্চিত এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফওজিয়া মোসলেম বলেন, “ছয় বছরের শিশু থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ্ব গৃহিণী—জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নারীরা সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে ছয় থেকে নয় বছর বয়সী কন্যাশিশুদের ধর্ষণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি প্রমাণ করে, ধর্ষণের জন্য কখনোই ভুক্তভোগী দায়ী নয়; দায়ী অপরাধী এবং সেই সামাজিক মানসিকতা, যা অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়।”

তিনি আরও বলেন, “ধর্ষণের পাশাপাশি হত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ফলে নারী শুধু যৌন সহিংসতারই নয়, জীবনহানিরও বড় ঝুঁকিতে পড়ছেন। এটি শুধু নারীর সংকট নয়, বরং পুরো সমাজের নিরাপত্তা ও মানবিকতার সংকট।”

গণমাধ্যমের ভূমিকার বিষয়ে ফওজিয়া মোসলেম বলেন, “সংবাদমাধ্যমকে শুধু ঘটনা প্রকাশ করলেই হবে না, এর সামাজিক ও কাঠামোগত কারণও তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশে সংবেদনশীলতা বজায় রেখে অপরাধীদের পরিচয় ও দায়ও দৃশ্যমান করতে হবে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, “ধর্ষণ, হত্যা ও এ ধরনের সহিংসতা ফৌজদারি অপরাধ। এসব ঘটনায় স্থানীয় সালিসের মাধ্যমে আপসের চেষ্টা আইন ও বিচারপ্রক্রিয়ার পরিপন্থী এবং এতে অপরাধীদের দায়মুক্তি নিশ্চিত হয়।”

নারী নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনাকে সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও নারী আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার সম্পাদক রীনা আহমেদ। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।