বিষয়টি কিন্তু বেশ পরিহাসের এবং চমকপ্রদ: কোনো বিরোধী দল নয়, একদল ছন্নছাড়া তরুণ ভারতীয়ই প্রধানমন্ত্রীকে নতি স্বীকারে বাধ্য করলেন। গত শনিবারে, যখন এই কলাম ছাপাখানায় যাচ্ছিল, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রী অবশেষে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে রাজি করান।
কলাম লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট শিক্ষামন্ত্রীকে তিনি ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন—তাই তাঁর সরে যাওয়াটা জরুরি ছিল বলেও মনে করছেন। তবে তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় ভারত কোনো না কোনো দিক থেকে উপকার পেয়েও থাকতে পারে। একই সঙ্গে লেখকের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মূলত নতুন একটি কঠোর আইনের কথাই বলা হয়—যে আইনটি কতটা ‘কঠোর’ হবে, তা তিনি নিজেই অন্তত পাঁচবার শোনান। কিন্তু লেখকের দৃষ্টিতে, এটি যথেষ্ট নয়।
এ প্রসঙ্গে লেখকের আরও একটি পর্যবেক্ষণ রয়েছে—বিরোধীদলীয় নেতা যখন বলেন, মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা নাকি বিশ্বজয়ী ছিল, তখন তিনি স্পষ্টতই বিভ্রান্তির মধ্যে আছেন বলে উল্লেখ করা হয়; বিষয়টি মোটেও তেমন ছিল না বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।
লেখক লিখেছেন, ‘তেলাপোকাদের লড়াইয়ের পরিধি এখন অনেক বড়’। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, যেসব ভারতীয় শিশুর বেসরকারি স্কুলে পড়ার সামর্থ্য ছিল না, তারা এমন এক স্কুল–ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল, যা নার্সারি থেকে শুরু করে হাইস্কুল পাস করা পর্যন্ত প্রতি পদে তাদের হতাশ করেছে। একই সঙ্গে বলা হয়, ভারতের বেশির ভাগ বড় রাজ্যের ক্ষমতায় বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীরা থাকলেও তাঁরা স্কুলের হাল ফেরাতে পারেননি।
এদিকে লেখকের ভাষায়, তাঁদের মূল মনোযোগ ছিল প্রাচীন ভারতকে মহিমান্বিত করা এবং মোগল আমলকে হেয় করে ইতিহাস নতুন করে লেখায়। মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতের ‘সাফল্য’ জাহির করার কথাও উল্লেখ করেছেন লেখক—তবে সেটি অন্য দিনের আলোচনার বিষয় বলে জানান।
আজ বরং লেখকের মতে আলোচনা করা উচিত যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) আন্দোলন কী অর্জন করল। তিনি জানান, এই আন্দোলন ভারতের নানা শহর থেকে শুরু করে মফস্সলেও ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলন শুরুর দিকে যাঁরা ‘আরশোলাদের’ শক্তি আঁচ করতে পেরেছিলেন, তাঁদের একজন হিসেবে গত সপ্তাহে সংসদে বিশাল পদযাত্রার কয়েক দিন আগে লেখক যন্তর মন্তরে এক দুপুর কাটিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন। সেখানে বিজেপির প্রভাবশালী ‘বুদ্ধিজীবীদের’ তরুণদের ‘নৈরাজ্যবাদী’ ও ‘অ্যাকটিভিস্ট’ বলে উড়িয়ে দেওয়াকে কতটা যুক্তিযুক্ত মনে করা যায়—সেটি দেখতে চেয়েছিলেন বলেও তিনি লেখেন এবং তাঁর ভাষায়, স্পষ্টতই তাঁরা ভুল ছিলেন।
সেদিন দুপুরে যেসব তরুণের সঙ্গে লেখকের কথা হয়েছিল, তাঁদের ক্ষোভ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ছিল এবং দাবি অনেক আগেই শোনা উচিত ছিল—এমন বক্তব্যও তিনি তুলে ধরেন। পাশাপাশি লেখকের পর্যবেক্ষণ, এখন পুরো বিশ্ব জেনে গেছে যে ভারতীয় তরুণদের বিশ্বাস—এই ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রযন্ত্র তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিটিকে তিনি স্রেফ জবাবদিহির এক আকুল আরজি হিসেবে দেখেছেন, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো প্রধানমন্ত্রী তা উপলব্ধি করতে পারছেন না—এমন মন্তব্য করেছেন।
যন্তর মন্তরের পরিস্থিতি গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যায় বলে লেখক মনে করেন, সেখানকার তরুণেরা প্রকৃতপক্ষে এক উন্নত ভারতের স্বপ্ন দেখেন। তাঁদের দাবিতে সশব্দে ‘বন্দে মাতরম’ ও জাতীয় সংগীত গান—এই বিষয়টি বিজেপিসহ সবাইকে বুঝিয়ে দিতে চাওয়ার চেষ্টা হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে জাতীয়তাবাদের ওপর কেবল তাঁদেরই একচ্ছত্র অধিকার নেই।
লেখকের আরেকটি বর্ণনায় উঠে এসেছে—হিন্দু তরুণেরা দ্বিধাহীনভাবে অন্য ধর্মের মানুষ অর্থাৎ মুসলিম, খ্রিষ্টান ও শিখদের হাত থেকে খাবার তুলে নিচ্ছেন এবং একসঙ্গে বসে খাচ্ছেন। এর মাধ্যমে তাঁরা প্রমাণ করছেন—একসময় পারস্পরিক সম্প্রীতির যে ভারতে বসবাস করা যেত, তা আজও বিলুপ্ত হয়ে যায়নি—এমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন লেখক। তবে মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই সম্প্রীতিতে ফাটল ধরানোর একের পর এক চেষ্টা দেখা গেছে বলেও তিনি জানান; কখনো গরুর নামে, আবার কখনো মন্দির কিংবা ধর্মের দোহাই দিয়ে।
দিল্লির রাজপথে আগুনের মতো পরিস্থিতির উল্লেখ করে লেখক লিখেছেন, সংসদ তখন চুপ থাকতে পারে না। যাঁরা অতিরিক্ত ধর্মান্ধতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রতিবাদ করেছেন, স্বঘোষিত ‘হিন্দুত্ববাদী’ ধারক-বাহকেরা তাঁদের অনায়াসেই ‘পাকিস্তানি’ বা ‘দেশবিরোধী’ ট্যাগ দিয়েছেন—এমন অভিযোগও তিনি তুলে ধরেন। গত সপ্তাহে তথাকথিত ‘স্বাধীন’ টিভি চ্যানেলগুলোর প্রচ্ছদ খেয়াল করলে দেখবেন—হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের রক্ষক সেজে বসা কিছু সংবাদ সঞ্চালক অনবরত ‘বিদেশি চক্রান্ত’ নিয়ে চেঁচামেচি করে গেছেন বলেও লেখক দাবি করেন।
এরপর প্রশ্ন তোলেন লেখক: নামজাদা আইনজীবীরা সাক্ষাৎকার দিয়ে শেষবিচারের দিনের মতো হুঁশিয়ারি দিচ্ছিলেন যে ভারতের এই ‘উত্থান’ নাকি বিশ্বের বড় কোনো শক্তি সহ্য করতে পারছে না। কিন্তু প্রশ্ন—কিসের উত্থান? মোদির শাসনামলে যদি জীবনমানের সত্যিই কোনো উন্নতি হতো, তবে কি হাজার হাজার তরুণ বিক্ষোভ দেখাতে রাজপথে নেমে আসতেন—এমন ভাবনায় তিনি সরব হন।
লেখকের মতে, সত্যিটা হচ্ছে—গত বারো বছরে যেসব নতুন রাস্তা, হাইওয়ে, বন্দর আর বিমানবন্দর তৈরি হয়েছে, তা দেখে একদল মধ্যবিত্ত ভারতীয় কিছুকালের জন্য বিভ্রান্তিকর স্বস্তিতে আত্মহারা হয়েছিল। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পারছে, এসব অবকাঠামো শেষ পর্যন্ত তাদের ব্যক্তিগত জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেনি।
তিনি আরও লিখেছেন, তারা এখনো দারিদ্র্যের এক দুষ্টচক্রে বন্দী। এই বন্দিদশা থেকে বাঁচতে তারা চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলী বা কম্পিউটার বিজ্ঞানী হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু পরীক্ষা পাসের পর তারা চাকরি খোঁজার এক নতুন চক্রে আটকে পড়ে। বেসরকারি খাতের জন্য তারা পর্যাপ্ত যোগ্য হয়ে উঠতে পারে না, তাই একমাত্র ভরসা সরকারি চাকরি, যা দিন দিন অপ্রতুল হয়ে পড়ছে বলে লেখক উল্লেখ করেন। আর যাদের সামর্থ্য আছে, তারা উন্নত বিশ্বে পাড়ি জমিয়ে একপ্রকার অর্থনৈতিক শরণার্থীতে পরিণত হয়—যেখানে অন্তত একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে বলেও মন্তব্য করেন।
ব্যক্তিগতভাবে লেখক জানান, তিনি এই তেলাপোকাদের আন্দোলনকে সম্পূর্ণ সমর্থন করেন এবং তাঁদের দুঃখ ও ক্ষোভ উপলব্ধি করতে পারেন। তাঁর আন্তরিক প্রত্যাশা আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগেই সিজেপি যেন একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর মাধ্যমে তারা বিজেপিকে বুঝিয়ে দেবে বলেও লেখক আশা প্রকাশ করেন—এবার তাদের সামনে এমন এক নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসবে, যারা প্রথাগত সুবিধাবাদী বিরোধী নেতাদের মতো কোনো বংশানুক্রমিক অধিকার থেকে আসেনি।
ভারতের ককরোচ আন্দোলন বাংলাদেশকে যে বার্তা দিচ্ছে—এই শিরোনামে লেখক আরও বিস্তৃতভাবে বলেন, ভারতের রাজনীতি ও প্রশাসনে এখন তরুণ ও নতুন মুখের ভীষণ প্রয়োজন, যাতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বনাম ‘হিন্দুত্ব’-র এই বিরক্তিকর আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসা যায়। দুটি শব্দই এখন তার মূল অর্থ হারিয়েছে—তথাকথিত ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ রাজনীতিকেরা বিজেপিতে যোগ দেওয়া মাত্রই রাতারাতি উগ্র সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠেন—এ বিষয়টাকেই বড় প্রমাণ হিসেবে লেখক তুলে ধরেন।
তাভলীন সিং ভারতীয় সাংবাদিক
দ্য ইন্ডিয়ানএক্সপ্রেস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত