আগামীর বদলে যাওয়া কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণদের প্রস্তুতি নিতে এখন একযোগে ভাবনা, বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা এবং শিল্পক্ষেত্রের সক্রিয় সম্পৃক্ততা দরকার। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তন এবং ভোক্তাদের আচরণে রূপান্তরের ফলে চাকরির বাজারের চাহিদাও দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে কর্মদক্ষতার সংজ্ঞাও নতুনভাবে নির্ধারিত হচ্ছে। এ অবস্থায় একাডেমিক পড়াশোনার সঙ্গে বাস্তব কর্মজগতের কার্যকর যোগসূত্র স্থাপন আগের তুলনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ স্নাতক হয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে মোট বেকারের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক—যা ইঙ্গিত দেয়, কেবল একাডেমিক সাফল্যই কর্মজীবনের জন্য যথেষ্ট নয়। ব্যবহারিক দক্ষতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা তরুণদের প্রস্তুতি আরও জোরালো করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষাকে আরও ব্যবহারিক ও প্রাসঙ্গিক করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিয়োগকর্তাদেরও তরুণদের শেখা ও বিকাশের যাত্রায় অংশীদার হওয়া দরকার। কারণ কর্মজীবনের প্রস্তুতি একদিনে তৈরি হয় না; শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তা গড়ে তোলা সম্ভব।
এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখে ইউনিলিভার বাংলাদেশ প্রতিভা বিকাশকে কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে ধরে রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষায়, ‘পিপল আর অ্যাট দ্য হার্ট অব আওয়ার বিজনেস’—অর্থাৎ মানুষের উন্নয়নই টেকসই ব্যবসায়িক অগ্রগতির ভিত্তি। পরিবর্তিত কর্মপরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং সক্ষমতা গড়ে তুলতে ইউনিলিভার ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে ‘বিজমায়েস্ট্রোজ এক্স ইউএফএলপি ২০২৬’—যা তরুণদের দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং নেতৃত্ব বিকাশের লক্ষ্যে ইউনিলিভার বাংলাদেশের একটি সমন্বিত উদ্যোগ।
২০১০ সালে শুরু হওয়া বিজমায়েস্ট্রোজ গত ১৬ বছরে শিক্ষার্থীদের ‘রিয়েল বিজনেস’-এর অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে একটি শক্ত ভিত্তি গড়েছে। এই প্ল্যাটফর্মের উদ্দেশ্য—তরুণদের কৌশলগত চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং বাস্তব ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা তৈরি করা।
১৬তম আসরে বিজমায়েস্ট্রোজকে ইউনিলিভার ফিউচার লিডার্স প্রোগ্রামের (ইউএফএলপি) সঙ্গে একীভূত করে আরও সমন্বিত নেতৃত্ব বিকাশমুখী যাত্রা তৈরি করা হয়েছে। এতে প্রতিভা চিহ্নিতকরণের পাশাপাশি একটি কাঠামোবদ্ধ শেখার প্রক্রিয়াও রয়েছে, যেখানে অংশগ্রহণকারীদের বিশ্লেষণী দক্ষতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্বের সক্ষমতা—সব একসঙ্গে বিকশিত করার সুযোগ তৈরি হয়।
উদ্যোগটির থিম ‘ডিসরাপ্ট টু উইন’—যা পরিবর্তনকে বোঝা, উদ্ভাবনকে গ্রহণ করা এবং চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তর করার মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়। বৈশ্বিক ও স্থানীয় ব্যবসায়িক বাস্তবতায় এই দক্ষতাগুলোর গুরুত্বও বাড়ছে।
‘বিজমায়েস্ট্রোজ এক্স ইউএফএলপি’কে কেবল প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এটিকে একটি লিডারশিপ ইনকিউবেশন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এখানে ধাপে ধাপে শেখা, প্রয়োগ এবং মূল্যায়নের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে অংশগ্রহণকারীরা যান। শিল্পের পরিবর্তনশীল ধারা, ভোক্তাদের আচরণের রূপান্তর এবং একটি শীর্ষস্থানীয় এফএমসিজি প্রতিষ্ঠানের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কেও তারা ব্যবহারিক জ্ঞান নিতে পারেন।
এই যাত্রার অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘লার্ন টু লিড’ ক্যাম্পাস রোড শো পরিচালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে তাদের সামনে কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা, ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা এবং দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ওয়েবিনার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে, যাতে শেখার এই উদ্যোগটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।
প্রোগ্রামটির নির্বাচনপ্রক্রিয়াও অভিজ্ঞতাভিত্তিকভাবে সাজানো। প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তিগত আবেদন, অ্যাপটিটিউড মূল্যায়ন এবং ডিজিটাল ইন্টারভিউর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের বিশ্লেষণী ও যোগাযোগ দক্ষতা যাচাই করা হয়। এরপর অংশগ্রহণকারীরা বুটক্যাম্পে অংশ নিয়ে ইউনিলিভারের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, ভোক্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাজারের পরিবর্তন সম্পর্কে বাস্তব ধারণা লাভ করেন।
ডিসকভারি সেন্টারের মতো ধাপগুলোতে অংশগ্রহণকারীরা দলগত কাজ, সমস্যার বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। এর মাধ্যমে তারা কর্মক্ষেত্রের কাছাকাছি অভিজ্ঞতা অর্জন করে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস ও প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। সর্বশেষ ধাপে বাস্তব ব্যবসায়িক সমস্যার ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত কেস উপস্থাপনার মাধ্যমে শেখা ও প্রয়োগের সমন্বয় ঘটে।
বিজমায়েস্ট্রোজের আরেকটি দিক হলো—এটি একাডেমিক শিক্ষা এবং বাস্তব ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার মধ্যকার ব্যবধান কমাতে চায়। অংশগ্রহণকারীরা ইউনিলিভারের বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান, যার মাধ্যমে বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। পাশাপাশি এ প্ল্যাটফর্ম তরুণদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা দক্ষতা বিকাশেও সহায়তা করে।
করপোরেট জগতে ইউনিলিভারকে ‘স্কুল অব লিডার্স’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর পেছনে রয়েছে প্রতিভা বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং একটি সুসংগঠিত পদ্ধতি। এই বিকাশ প্রক্রিয়া শিক্ষাজীবন থেকেই শুরু করার কথা বলা হচ্ছে—যেখানে বিজমায়েস্ট্রোজের মতো প্ল্যাটফর্ম তরুণদের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করে এবং তাদের নেতৃত্বের যাত্রার ভিত্তি তৈরি করে।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা শুধু কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত নয়; বরং পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। যারা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষ হবে, উদ্ভাবনকে এগিয়ে নেবে এবং টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখবে।
বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে সম্ভাবনা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সৃজনশীলতার কোনো ঘাটতি নেই—এমন মূল্যায়নও এসেছে এখানে। সেই সম্ভাবনার সঙ্গে সঠিক সুযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সংযোগ ঘটানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ‘বিজমায়েস্ট্রোজ এক্স ইউএফএলপি’-এর মতো উদ্যোগকে তাই সেই সংযোগ তৈরির একটি প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—যেখানে তরুণেরা শেখার, নিজেদের যাচাই করার এবং ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ পান।
সবশেষে বলা যায়, আগামীর কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুতি মানে শুধু প্রথম চাকরির জন্য তৈরি হওয়া নয়; বরং এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যা পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে, নতুনভাবে শিখতে এবং জটিল চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপ দিতে সহায়তা করবে। এই যাত্রায় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে একটি দক্ষ, দায়িত্বশীল ও ভবিষ্যৎ-প্রস্তুত কর্মশক্তি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে।