তথ্য ফিল্টার করা বর্তমান সময়ে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুর ১টায় বরিশাল সার্কিট হাউস মিলনায়তনে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের আয়োজনে বরিশাল বিভাগের সাংবাদিকদের কল্যাণে করণীয়বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন।

সভায় মন্ত্রী বলেন, "তথ্য ফিল্টার করাটা এখন বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে। এই গণমাধ্যমকে দুই ধরনের লোক ব্যবহার করছে, দুইজনের হাতে সাংবাদিকতার কার্ড রয়েছে। একদল তথ্যের প্রবাহের মধ্যে বস্তুনিষ্ঠতা যাতে দূষিত না থাকে সেটাকে কীভাবে মোকাবিলা করা যায় তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করছে। আরেক দল দূষিত করার জন্য সাংবাদিকতা করছেন।"

সাংবাদিকতা পেশার সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "কোন সাংবাদিকতা ব্লাকমেলিং, আর কোন সাংবাদিকতা আমাদের অনিবার্য— এটাকে ভাগাভাগি করতে না পারলে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাকে পৃষ্ঠপোষকতা করা যাবে না। এই কাজ সরকার একা করতে পারবে না, আপনাদের অংশীদারত্ব লাগবে।"

পেশার কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, "সাংবাদিকতার মতো পেশাকে কাঠামোবদ্ধ করতে না পারার কারণে আমাদের সামনে আগে শুধু একটা চ্যালেঞ্জ ছিলো—‘ফ্রিডম অব প্রেস’। এখন তার চেয়ে বেশি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে ‘মিস ইনফরমেশন’।"

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিশিষ্ট সম্পাদক, সাংবাদিক ও পত্রিকা মালিকদের সাক্ষাতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "তারা সবাই প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন যে, তারা এই প্রথম সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের চাপ অনুভব করেননি। এই কথাও সত্য—তারা চাপ অনুভব করেনি ঠিক আছে, কিন্তু তাদের জীবনমানের কি গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তার মাত্রাটা কি বেড়েছে, তাদের বেতনের নিশ্চয়তা কি বেড়েছে, তাদের পেশাগত পরিবেশ কি উন্নত হয়েছে, সাংবাদিকদের সঙ্গে মালিকের যে সম্মানজনক সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন তা কি হয়েছে, ওয়েজবোর্ড মানা না মানার বিষয়ে সরকারের যে ভূমিকা রাখা দরকার সরকার কি সেটা পেরেছে।"

বর্তমান সংঘাতের ধরন বদলে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "অতএব এখন পক্ষ আর এটা না যে, রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের গোয়েন্দা বাহিনী বনাম একজন মুক্ত সাংবাদিকতার সাহসী ব্যক্তি। এটাই এখন বিরোধ না। এখন তার চেয়ে অনেক বড় বিপদ হচ্ছে—একজন পেশাদার দায়িত্বশীল যোগ্য সাংবাদিক, তিনি তার পেশায় সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকতে পারবে কি পারবে না। অন্য একজন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র নাগরিক যেমন অবসরকালীন জীবনযাপন করেন, তিনিও তেমন অবসরকালীন জীবনযাপন পাবেন কি পাবেন না।"

সাংবাদিকদের কল্যাণে সবার সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, "আমি মালিকপক্ষের সঙ্গে ওয়েজবোর্ড নিয়ে কথা বলছি, সম্পাদকদের নিয়ে সম্পাদকীয় নীতিমালা নিয়ে কথা বলছি, সাংবাদিক ইউনিয়নের সঙ্গে কথা বলছি।"

সরকারি সুবিধা ও মিডিয়া রেটিংয়ের অনিয়ম নিয়ে তিনি বলেন, "পত্রিকাগুলোতে যে সরকারি সুবিধা, বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র বণ্টন করা হয় সেই ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা নেই। টেলিভিশন জার্নালিজমে টিআরপির কোনো সাইন্টিফিক মেথড নেই, মাত্র কয়েকটি সেটবক্স দিয়ে মিথ্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পত্রিকার ছাপার সংখ্যার ব্যাপারে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী বাহাদুর তার ক্ষমতার বলে সেটার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত হচ্ছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে মিথ্যা বলার দায়িত্ব নিচ্ছেন। যে পত্রিকা ছাপে ১ লাখ, সেই পত্রিকাকে বলছে ১০ লাখ। অথচ এটাকে সত্য বলেও সরকার যে উপকার করছে তাতে মিথ্যা কথা বলার দরকার নেই।"

সংশোধনের উদ্যোগ সম্পর্কে মন্ত্রী জানান, "বিজ্ঞাপন, মিডিয়া লিস্টিং, ক্রোড়পত্র বণ্টন, টিআরপি, নিউজ পেপার রেটিং পয়েন্টে আমরা হাত দিতে শুরু করেছি। এটা এমন নাজুক সংবেদনশীল ও জরুরি জায়গা যে এটাকে যদি কাঠামোগতভাবে দাঁড় করতে না পারি তাহলে জাতিকে অনেক খেসারত দিতে হবে। এই কাজটার সঙ্গে সাংবাদিকরা ও মালিকপক্ষরা জড়িত। একটা সাংবাদিকতার জগতের গুণগত পরিবর্তনের সফল জাতি শত শত বছর পাবে।"

নেতৃত্বের গুণগত মান নিয়ে তিনি বলেন, "ভাসা ভাসা বিষয়গুলো নিয়ে কথা না বলে, ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে সাংবাদিকতার নেতৃত্ব না দিয়ে গভীরে প্রবেশ করতে হবে। আমি যতটুকু সম্ভব আপনাদেরকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করব। সাংবাদিকদের কল্যাণ মানেই আমি মনে করি দেশের কল্যাণ ও জাতির কল্যাণ। যে কোনো কিছুর বিনিময়ে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাকে আমাদেরকে টিকিয়ে রাখতেই হবে, প্রয়োজনে রক্তের বিনিময়ে, প্রয়োজনে জীবনের বিনিময়ে।"

সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল বাছিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য কাওছার হোসেন খন্দকার, বিএফইউজে’র প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক শাহজাহান সাজু এবং বরিশাল জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আযাদ আলাউদ্দিন।