নাটোরে চলনবিল ও হালতিবিল এলাকায় বর্ষার পানি বাড়ার সাথে সাথে স্থানীয়দের যাতায়াত ও মাছ ধরার প্রধান মাধ্যম ডিঙি নৌকা তৈরির ব্যাপক ধুম পড়েছে। বিশেষ করে গুরুদাসপুর উপজেলার চাঁচকৈড় এলাকার কারিগর ও ব্যবসায়ীরা বর্তমানে দিনরাত নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন। তবে কাঠ, লোহা ও কারিগরদের মজুরিসহ কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত মুনাফা নিয়ে শঙ্কিত নৌকার মালিক ও কারিগররা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্ষা মৌসুমে চলনবিল প্লাবিত হয়ে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার এক গ্রামের সাথে অন্য গ্রামের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই সময়ে বিলঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও মাছ ধরার একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে ডিঙি নৌকা। ফলে প্রতি বছর বর্ষায় চাঁচকৈড় ফার্নিচার পট্টিতে নৌকা তৈরির ব্যস্ততা বৃদ্ধি পায়। আসবাবপত্র তৈরির পাশাপাশি বাড়তি আয়ের লক্ষ্যে ফার্নিচার পট্টির মালিকেরা এই নৌকা তৈরি করান।
নৌকা তৈরিতে প্রধানত মেহগনি, কাঁঠাল, বাবলা ও নিম গাছের কাঠ ব্যবহৃত হচ্ছে। ফার্নিচার পট্টিতে কারিগরদের কেউ করাত দিয়ে কাঠ কাটছেন, কেউ কাঠ সাইজ করছেন, আবার কেউ পেরেক মারছেন। কেউ কেউ তৈরি করা নৌকার ওপর পাতলা টিনের শিট বসাচ্ছেন। চারদিকে হাতুড়ি ও করাতের শব্দে মুখরিত পরিবেশ। কেনাবেচার জন্য রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে নতুন নৌকা। প্রতি সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার ঐতিহ্যবাহী চাঁচকৈড় হাট বসে, যেখান থেকে বিলঞ্চলের ক্রেতারা এসব ডিঙি নৌকা ক্রয় করেন।
নৌকা তৈরির কারিগর আফজাল হোসেন, শরীফুল ইসলাম ও মিজান জানান, "সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পরিশ্রম করলে তারা দুটি নৌকা তৈরি করতে পারেন। প্রতিটি নৌকা তৈরিতে এক হাজার টাকা মজুরি পান তারা। তবে বর্তমান বাজার অনুযায়ী পারিশ্রমিক আর একটু বেশি হলে তাদের উপকার হতো।"
নৌকা বিক্রেতা শামীম হোসেন, ইয়ারুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, কাঁচামালের দাম ও মজুরি বাড়লেও তারা গত বছরের দামেই নৌকা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কাঠের মান ও সাইজভেদে ডিঙি নৌকা ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকায় এবং টিন মোড়ানো নৌকাগুলো ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাদের দাবি, বর্তমানে লাভ খুবই সীমিত।
অন্যদিকে হাটে আসা ক্রেতাদের মতে, চাঁচকৈড় হাটের নৌকার সুনাম দীর্ঘদিনের। তবে এবার নৌকার দাম কিছুটা বেশি বলে তারা জানান। গত বছর যে নৌকা পাঁচ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এবার তা ৬ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে।
চাঁচকৈড় ফার্নিচার পট্টি মালিক সমিতির সভাপতি শামীম হোসেন বলেন, "এখানে মানসম্মত কাঠ ও দক্ষ কারিগর দ্বারা নৌকা তৈরি করা হয়। হাটে নৌকা প্রতি মাত্র ২০০ টাকা খাজনা নেওয়া হয়, যা অত্যন্ত সীমিত। মালিক সমিতি সার্বিক দেখভাল করায় কেনাবেচায় কোনো বিশৃঙ্খলা হয় না।"