একটি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে রোকেয়া বেগম (ছদ্মনাম) যখন নারী সদস্য পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন প্রথম যে পদক্ষেপটি নেন সেটি ছিল উন্নয়নকেন্দ্রিক নয়। তিনি মুঠোফোনের নম্বর বদলেছিলেন।
রাত গভীর হলেই তাঁর পুরোনো নম্বরে আসত এমন সব বার্তা, যেগুলো পড়লে মনে হয় রাজনীতি করার অপরাধে তাঁকে কোনো অদৃশ্য আদালত শাস্তি দিচ্ছে। রাজনৈতিক যোগ্যতা তখন আর আলোচনায় আসতে পারেনি; চরিত্রহনন আর হেট-স্পিচের এক ‘সুপরিকল্পিত’ বেড়াজাল তাঁকে ঘিরে ফেলে। শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। এই প্রস্থান তাঁর কাছে মনে হয়, তিনি কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর কাছে পরাজিত হননি—বরং অদৃশ্য এক শক্তির কাছে।
এ ধরনের অনলাইন নিপীড়নের পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় নারী রাজনীতিতে আগ্রহ কমিয়ে দেয়। নিজ দলের সহযোগিতা না পাওয়া, পারিবারিক আপত্তি, কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে টিকতে না পারাও ওই আগ্রহ ক্ষয় করে।
আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নেই প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা; যতটুকু আছে সেটুকুও পর্যাপ্ত নয়। এই অবস্থায় যখন জাতিগত সংখ্যালঘু, দলিত ও অন্যান্য নিম্নবর্গের জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নারীসহ জেন্ডার-বৈচিত্র্যের জনগোষ্ঠী সহিংসতার সম্মুখীন হয়, তখন তাদের এই পরিচয়ের কারণে সহিংসতার মাত্রা আরও তীব্র হয়।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) সাম্প্রতিক গবেষণায় ৪৩ জন নারী রাজনীতিবিদের সাক্ষাৎকারে এ দেশের নারীদের রাজনৈতিক পথচলার যে বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে, তা বলছে—রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি পদ্ধতিগত, বহুমাত্রিক এবং দীর্ঘস্থায়ী।
সহিংসতা শুধু নির্বাচনের দিন মারামারি বা বুথ দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। নারীর শরীর, পরিবার, বৈবাহিক অবস্থা ও নৈতিকতাকে কেন্দ্র করে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে নারী প্রার্থীকে কেন্দ্র করে কমপক্ষে ১২টি বড় সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে আহত হয়েছেন অন্তত ছয়জন নারী।
গবেষণা ও আন্তর্জাতিক তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৬ শতাংশ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৬০ শতাংশ নারী সংসদ সদস্য অনলাইনে ও অফলাইনে এই জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন।
ডিপফেক’ আতঙ্কের প্রসঙ্গটিও আলাদা করে আলোচিত হচ্ছে—এখন ভিডিও মানেই সন্দেহ। তবে প্রচলিত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে এই বিশেষায়িত অপরাধকে এখনো ‘রাজনীতির স্বতন্ত্র সহিংসতা’ হিসেবে স্বীকৃতিই দেওয়া হয়নি। ‘সহিংস ঘটনা’ হিসেবে স্বীকৃতির মানসিকতাও এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত রয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, এবং অভিযোগও কম আসে।
এ ছাড়া ডিজিটাল সহিংসতা নারীদের জনসমক্ষে আসতে নিরুৎসাহিত করে, দলীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে এবং গুরুতর মানসিক ক্ষতি করে—এ ধরনের সহিংসতা রোধে কার্যকর কোনো পদ্ধতি দৃশ্যমান নয় বলে গবেষণার আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের রয়েছে—যেসব ব্যবস্থা, সেগুলোর সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। রাজনৈতিক দল ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থা দুর্বল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে নারীদের জীবন নানা কারণে অনিরাপদ। রাজনীতিতে সরাসরি না এলেও নারীরা দৈনন্দিন জীবনেই ব্যাপকভাবে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার মুখোমুখি হন। এতে রাজনীতিতে প্রবেশের আগেই একজন নারীর স্বাভাবিক চলাফেরা, স্বাধীনতা ও অধিকার-প্রাপ্তিতে ছন্দপতন ঘটে। অনিরাপদ সামাজিক পরিবেশে নিরাপত্তা তাই সব সময় অনিশ্চিত।
কোনো নারী যদি প্রতিনিয়ত এই পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে রাজনীতিতে নাম লেখাতে চান, তখনই সহিংসতা ও বিপদ নতুন মাত্রা পায়। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে শুরু করে আইনি হয়রানি, অসম্মানজনক আচরণ, সম্পদ ধ্বংস, ডিজিটাল সহিংসতা, যৌন হয়রানি, কিংবা শারীরিক হামলার মতো সংকট—নারী রাজনীতিবিদের জীবনে নানা রূপে দেখা দিতে পারে। এসব সহিংসতার প্রভাব নারীর জীবনে নানামুখী ক্ষতি তৈরি করে। নারীরা ক্ষেত্রবিশেষে এ ধরনের ঘটনা বা সহিংসতা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলেও তা স্থায়ী বা কাঠামোবদ্ধ সমাধান নয়।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। রাজনীতিতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে জাতীয় জরিপ ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণের আলাদা সূচকে অন্তর্ভুক্ত করে এর স্বতন্ত্র সংজ্ঞা ও স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে। নির্বাচন কমিশনকেও কার্যকর আইনি ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
যৌন হয়রানি, চরিত্রহনন ও ডিজিটাল সহিংসতাকে আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি টেকসই ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াব্যবস্থা (রেসপন্স সিস্টেম) গড়তে পারলে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে মত দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নারীর প্রতি আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে প্রয়োজনে প্রার্থিতা বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতাও নির্বাচন কমিশনের থাকা উচিত।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে ২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলে একটি স্বাধীন ও নিরাপদ অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থা গড়ে তোলা বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হয়েছে। কানাডার হাউস অব কমন্সের মতো আমাদের দেশেও রাজনৈতিক দল ও সংসদে এমন একটি পরিবেশ তৈরির পরামর্শ আছে, যেখানে প্রতিটি সদস্যকে জেন্ডার সংবেদনশীল আচরণের অঙ্গীকারে স্বাক্ষর করতে হয়। প্রযুক্তিভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ও তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন অনলাইন প্রচারণা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও জবাবদিহি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, সব নারীর ঝুঁকি এক নয়—এই বক্তব্য সামনে আনা হয়েছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, দলিত বা প্রান্তিক অঞ্চলের নারী রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে বাধা আরও দ্বিগুণ হতে পারে। তাই সব নীতি ও সুরক্ষামূলক পদক্ষেপে বহুমাত্রিক পরিচয় ও জাত-বর্ণের বৈষম্যহীনতাকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
একজন নারীনেত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কুৎসিত আক্রমণের শিকার হয়ে মাঝপথে রাজনীতি ছেড়ে ঘরে ফিরে গিয়েছিলেন—এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে লেখক মনে করিয়ে দিয়েছেন, তিনি কেবল একা হেরে যাননি। তাঁর সঙ্গে হেরে গেছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুশাসিত সমাজের স্বপ্ন। রোকেয়া বেগম তাঁর ফোন নম্বর বদলেছিলেন, কিন্তু সমাজ থেকে সেই ভয়ের পরিবেশটি বদলে দেওয়া যায়নি। লেখকের মতে, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলো যতদিন পর্যন্ত রূপকথার হাইড্রার মতো বহুরূপী এই সহিংসতাকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকার করে এর বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক প্রাচীর না তুলবে, তত দিন এ দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর তথা নারীদের প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব কেবল এক দূরবর্তী আকাঙ্ক্ষাই হয়ে থাকবে।
জিহাদ আল মেহেদী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে (বিআইজিডি) ডেপুটি ম্যানেজার (মিডিয়া অ্যান্ড এনগেজমেন্ট) হিসেবে কর্মরত।
মতামত লেখকের নিজস্ব