কক্সবাজারের মহেশখালীতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে এক অগ্নিদুর্ঘটনার ফলে দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার কার্যক্রম, যানবাহন চলাচল এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন রান্নাবান্নায়। নাগরিকরা চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা আবারও স্পষ্ট করে দিল যে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির কারণে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাতের ফলে গত মার্চ থেকেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। একদিকে উচ্চমূল্যে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস ক্রয় করতে হচ্ছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। সমঝোতা ভেঙে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় সংঘাতে জড়ানোর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী। চাহিদার বিপরীতে জোগান ও সরবরাহে সামান্য ঘাটতি দেশের অর্থনীতির ওপর কতটা মারাত্মক ও বহুমুখী প্রভাব ফেলতে পারে, তা মার্চ-এপ্রিল মাসেই পরিলক্ষিত হয়েছে। এরই মাঝে মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মুক্তকণ্ঠের খবর অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য ও আরব আমিরাত থেকে বিশেষজ্ঞ দল এলেও বয়লার মেরামত করে জাতীয় গ্রিডে কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে, তা নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি। ফলে সংকট কাটিয়ে উঠতে আরও সময় লাগবে। এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আবাসিক গ্রাহকেরা। দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবারের রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে অনেকে বাধ্য হয়ে ইনডাকশন ও বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন, যা তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছিল সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট। একটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাহিদার ৪৫ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে ঢাকা ও জেলা শহরের সিএনজি পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেকে গ্যাস পাচ্ছেন না, যার ফলে সিএনজি চালিত যানবাহনের চালকদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শিল্পকারখানাতেও উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে এবং বিকল্প হিসেবে ডিজেল ও এলপিজি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সংকট দীর্ঘায়িত হলে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে।

জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমাতে স্থল ও সমুদ্রে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যমান স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। দেখা যাচ্ছে, এলএনজি টার্মিনালের সামান্য কারিগরি ত্রুটি বা দুর্ঘটনা পুরো জ্বালানি খাতকে সংকটে ফেলে দিচ্ছে। চলতি বছরেই একাধিকবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘ দিন ধরেই এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে স্থলভাগে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কথা বলে আসছেন।

আমাদের মনে হয়, এলএনজির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্থলভাগে আরেকটি টার্মিনাল নির্মাণ এখন জরুরি কর্তব্য। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে উচ্চমূল্যে কেনা এলএনজি যদি যথাযথভাবে ব্যবহার করা না যায়, তবে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক।