বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা এবং সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গুণী অভিনেতা আফজাল হোসেন। তাঁর মতে, সমাজের একটি বড় অংশ সুনাগরিক হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
ফেসবুক পোস্টে অভিনেতা আফজাল হোসেন লিখেছেন, ‘আমাদের কি হবে? মন ভর্তি সন্দেহ, অসন্তুষ্টি, স্বার্থপরতা, অপরকে খাটো করে দেখার প্রবণতা আর অতি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নিজ বা দেশের ভালো চাইলে, কপালে কখনোই কি ভালো জুটবে! ভালো কিছুতে আমরা সম্মানিতবোধ করি না। কোনো ভালো খবর আমাদের গর্বিত করে না। আমরা আগ্রহী মন্দ খবর শুনতে, দেখতে এবং পরমানন্দে সেই মন্দ নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে গল্প করতে।’
মানুষের পরনিন্দা ও সমালোচনার প্রবণতা নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘পরনিন্দা, সমালোচনা আমাদের উজ্জীবিত রাখে। অবিশ্বাস, সন্দেহ করে মনে সুখ পাই। আমরা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠবার জন্য সগৌরবে অসভ্যতা করি। অসভ্যতা করতে পারাকে এখন বাহাদুরি বলে বিবেচনা করা হয়। হাব ভাব দেখে মনে হয়, মায়ের পেট থেকে আমরা অনেকেই বিচারক বনে বেরিয়েছি। দেশের যে কোনো ঘটনা, যে কোনো মানুষ, মানুষের কথা এবং বিবিধ ভূমিকার বিচার করতে আমরা সদাপ্রস্তুত।’
বিশ্লেষণহীন মন্তব্যের সংস্কৃতি নিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘বিশ্লেষণে কারও আগ্রহ নেই, উৎসাহ দোষ চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে মহৎ প্রমাণ করা। ভাবি, এটাই দায়িত্ব পালন। দোষ পরের ঘাড়ে দিয়ে দেশের ভালো চাই, এমনই দায়িত্বশীল নাগরিক আমরা। মুখবই খুললেই দেখা যায়, দেশটা বিচার আর বিচারপতিতে ঠাসা।’
সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত রুনা লায়লার একক সংগীতানুষ্ঠান নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ ছিল। সেই অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা করার কথা ছিল আফজাল হোসেনের। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘সেই অনুষ্ঠান আমার উপস্থাপনা করার কথা। বহু চেনা মানুষ জিজ্ঞাসা করেছেন, উনি কি গাইবেন নাকি গান চালিয়ে দিয়ে ঠোঁট মেলাবেন?’ যারা এমন প্রশ্ন করেছেন তাদের উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছেন, ‘যারা প্রশ্ন করেছেন, তাঁরা রুনা লায়লাকে শিল্পী হিসাবে সম্মানের চোখে দেখেন একই সঙ্গে শোনা কথা বিশ্বাসও করেন। বিশ্বাস নড়বড়ে বলে সন্দেহ প্রকাশ করে মনে সুখ পান। তাতে একজন অসাধারণ শিল্পীর প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়, তা বুঝতে তাঁদের আর একটা জন্ম লাগবে।’
সাফল্যের খবরকেও ছোট করার প্রবণতা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। আবদুল্লাহ মোহম্মদ সাদের ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে মনোনীত হলে যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তা স্মরণ করে তিনি লিখেছেন, ‘“রেহানা মরিয়ম নূর” নামের একটা সিনেমা কান চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়ার পর অনেককেই বলতে শুনেছিলাম, কত টাকা দিয়ে সিনেমাটা সেখানে পাঠানো হয়েছে? ঘুষ শব্দটা ব্যবহার না করা হলেও পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যায়, কতটা হীনমন্যতায় ভোগা অসভ্য মানুষ চারপাশে মানুষ সেজে দিব্যি কিলবিল করে বেড়াচ্ছে। এই সব মানুষেরা নিজেদের অতি বুদ্ধিমান ভাবতে পছন্দ করে। তা করুক কিন্তু ভাষায়, আচরণে বেরিয়ে পড়ে আসলেই কে কোনো পদের, কেমন উচ্চতার।’
ইতিবাচক খবরের প্রতি মানুষের অনীহা নিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যারা এবার হিমালয় বিজয় করে ফিরে আসলেন, তা অধিকসংখ্যক মানুষের কাছে বিশেষ ঘটনা হয়ে ওঠেনি। একটা মোটামুটি খবর। যাতে তত মসলা নেই বলে বিশেষ হয়ে ওঠেনি।’
নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ চলচ্চিত্রটি ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে মনোনীত হলেও তা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে মনে করেন তিনি। এই বিষয়ে তিনি লিখেছেন, ‘এটাও দেশে পানসে স্বাদের খবর। বেশি তেল মসলা দিয়ে রান্না করা যে খবরটা সালাদ, ঠান্ডা পানীয় সহযোগে পরিবেশন করা হচ্ছে, তা পদত্যাগ বিষয়ক। মানুষ সে পদত্যাগ নিয়ে খুবই ব্যস্ততায় দিন কাটাচ্ছে। ভাবসাব দেখে মনে হয়, সে মহান পরিবর্তনের পর মানুষ ও দেশ তুড়িতেই বদলে যাবে।’
সবশেষে তাঁর মূল দাবি ছিল, ‘দেশের মানুষ বদলালে দেশ বদলাবে।’