জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের নয়, বরং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, ত্যাগ, স্বপ্ন ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার এক সংকলন। এই অভ্যুত্থানের মূল শক্তি ছিল এর স্বতঃস্ফূর্ততা। সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে এনে ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যেই নির্মিত হয়েছে তথ্যচিত্র ‘জুলাই ডায়েরিজ’।
রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীর তৈরি এই তথ্যচিত্রটির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনী পরবর্তী আলোচনা সভায় বক্তারা জুলাইয়ের স্মৃতি ও বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, এই তথ্যচিত্রে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।
এক ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের এই প্রামাণ্যচিত্রে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ, অরাজনৈতিক তরুণ এবং শ্রমজীবী মানুষের অভিজ্ঞতা ও আত্মত্যাগের গল্প স্থান পেয়েছে। তথ্যচিত্রটি নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে দেড় লাখ টাকার কিছু বেশি, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা সংগৃহীত হয়েছে গণ অর্থায়নের (ক্রাউডফান্ডিং) মাধ্যমে।
অনুষ্ঠানে ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, “গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং বিস্মৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য এ ধরনের তথ্যচিত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণ অর্থায়নে নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্র ইতিহাস সংরক্ষণের পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণেরও প্রতিফলন ঘটিয়েছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গণ-অভ্যুত্থানে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশা ও ভিন্ন ভিন্ন আকাঙ্ক্ষার মানুষ যুক্ত হওয়ায় একাধিক বয়ান তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাঁর মতে, গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর স্বতঃস্ফূর্ততা, তবে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক রূপান্তরের জন্য সংগঠিত রাজনৈতিক চর্চাও প্রয়োজন।
তরুণদের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি ও সাবেক শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য তাসলিমা আখতার বলেন, “গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস কেবল কয়েকজন নেতার নয়, বরং সাধারণ মানুষ ও শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণের ইতিহাস।” তিনি জানান, গণ-অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং তাঁদের গল্পগুলো ইতিহাসের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব সামান্তা শারমিন বলেন, “জুলাইকে বোঝার জন্য যত বেশি মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আসবে, ইতিহাস তত সমৃদ্ধ হবে।” তিনি আরও বলেন, “গণ অর্থায়নে নির্মিত শিল্পকর্ম নির্মাতাকে কোনো অর্থদাতার কাছে নয়, জনগণের কাছেই দায়বদ্ধ রাখে।”
‘জুলাই ডায়েরিজ’–এর নির্মাতা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী লিখন দত্ত অনুষ্ঠানে বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে নথিবদ্ধ করার উদ্দেশ্যেই এই তথ্যচিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। জুলাইকে ঘিরে শত মানুষের শত রকম অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই তথ্যচিত্র সেই অভিজ্ঞতার একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।”
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য প্রদান করেন লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ।