দুই দশক আগেও বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৯৭৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সময়ে সড়কপথের গণপরিবহন ৫৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৮ শতাংশে এবং মালামাল পরিবহন ৩৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮০ শতাংশে দাঁড়ায়। এই রূপান্তর মূলত ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন-চালিত যানবাহনের মাধ্যমে ঘটেছিল। ভারী যানবাহনের বড় অংশ আসত চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এবং হালকা যানবাহনের বেশির ভাগ আসত জাপান, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে। তবে এই জ্বালানি নির্ভরতা পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণের জটিলতায় বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করে এবং আরও লাখো মানুষ হাঁপানিসহ অন্যান্য রোগে ভোগে। দেশের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ৯ শতাংশের জন্য দায়ী পরিবহন খাত। অর্থনৈতিকভাবেও এর প্রভাব প্রকট। গত (২০২৫–২৬) অর্থবছরে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে খরচ ৯৩ শতাংশ বেড়ে ১১৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি তেল ও লুব্রিকেন্ট আমদানিতে খরচ আগের বছরের তুলনায় ৮৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৭৮৯ কোটি ডলার। চলতি বছরের এপ্রিল-মে মাসের জ্বালানিসংকট এবং তেলের দাম বৃদ্ধি সরকারকে বিকল্প পথের কথা ভাবতে বাধ্য করেছে, যার ফলস্বরূপ ইলেকট্রিক ভেহিকেল বা ইভি-শিল্পের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে সরকার।

২০২৪ সালে চীনা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি-র বাজারে প্রবেশের পর ইভি খাতে নতুন গতি আসে। তবে আগে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে প্রায় ৮৯ শতাংশ শুল্ক (যার মধ্যে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক) দিতে হতো, যা পরিবেশবান্ধব বাহনের প্রসারে বাধা ছিল। বর্তমানে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট যানবাহনের ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ-চালিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এই লক্ষ্যে শিল্প মন্ত্রণালয় ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২৫’ চূড়ান্ত করেছে। এতে ২০৪০ সাল পর্যন্ত স্থানীয় ইভি ও ব্যাটারি উৎপাদনকারীদের কর অব্যাহতি এবং সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের গাড়ির অন্তত ৩০ শতাংশ ইভি রাখা বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্য স্থির হয়েছে।

২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন, বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাক আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর ছাড়া সব শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে এবং চার্জিং স্টেশন যন্ত্রপাতিতে শূন্য শুল্ক আরোপ হবে। স্থানীয়ভাবে সংযোজিত ইভির ওপর ভ্যাট কমিয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ৫ শতাংশ এবং দেশীয় যন্ত্রাংশ ব্যবহার করলে ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিপরীতে, ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ সিসি ইঞ্জিনের জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত গাড়ির শুল্ক ১৩২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১৫৬ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সরকারি এই উদ্যোগের ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে এবং বাজারে দীপাল (এস ও-সেভেন ও এল ও-সেভেন), বিওয়াইডি (সিল-৬), জিএসি (আয়ন-ভি ও আয়ন-ওয়াই) এর মতো ব্র্যান্ডের গাড়ি এবং রিভো, ইয়াদিয়া, আইমা, হুয়াইহাই-এর মতো ইভি বাইক ও স্কুটি এসেছে। এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় বুয়েট অনুমোদিত নকশা ও নিয়ন্ত্রিত ই-রিকশার একটি পাইলট কর্মসূচি চালু হয়। পাশাপাশি ১৭ আসনের বৈদ্যুতিক স্কুলবাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংক ইভি ও হাইব্রিড গাড়ির জন্য ঋণসীমা বাড়িয়ে ৮০ লাখ টাকা করেছে (প্রচলিত গাড়ির ক্ষেত্রে ৬০ লাখ টাকা) এবং ঋণ-ইকুইটি অনুপাত শিথিল করে ৮০:২০ করা হয়েছে। এর ফলে ২০২৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সহস্রাধিক ব্যাটারিচালিত ও প্লাগইন হাইব্রিড গাড়ি বিক্রি হয়েছে, যার সিংহভাগই ২০২৫–২৬ সালে। শুধু ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১৭৮টি এবং চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ৮২টি ইভি আমদানি হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, "ইভি আমদানিকারক দেশ হওয়াই কেবল সরকারের লক্ষ্য নয়; বরং একটি ইভি উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতেই সরকার কাজ করছে।"

জিআইজেড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মি. মার্ক গমবার্টের মতে, "সমন্বিত নীতি প্রণয়ন, বিনিয়োগ ও সরকারি–বেসরকারি সহযোগিতায় বাংলাদেশের সামনে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই ইলেকট্রিক মোবিলিটি ইন্ডাস্ট্রি গড়ার সুযোগ রয়েছে।"

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর সুবিধার কারণে ইভি এখন মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে আসছে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই নীতির ধারাবাহিকতা থাকলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ইভি উৎপাদন ও রপ্তানির একটি নতুন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমিয়ে অর্থনীতিতে স্বস্তি আনবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।