বর্ষার আগমনে এক অনন্য রূপ ধারণ করেছে চলনবিল। দিগন্তজোড়া জলরাশি, মৃদু বাতাসে ঢেউয়ের খেলা আর নৌকার আনাগোনায় মুখর হয়ে উঠেছে বিলপাড়। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কুন্দইল সেতু কেন্দ্রিক এলাকায় এখন বর্ষার পূর্ণ আমেজ। এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে সিরাজগঞ্জ, নাটোর ও বগুড়াসহ আশপাশের জেলা থেকে প্রতিদিন ভিড় করছেন অসংখ্য ভ্রমণপিপাসু। কেউ পরিবারের সঙ্গে অবকাশ কাটাতে, আবার কেউ কেবল বর্ষার চলনবিলের রূপ দেখতে ছুটে আসছেন এখানে।
শুক্রবার বিকেলে তাড়াশ উপজেলা সদর থেকে কুন্দইল সেতুর পথে এগোলে বর্ষার চলনবিলের মোহনীয় রূপ চোখে পড়ে। দীঘি সদগুণা এলাকা পেরিয়ে কামারশোন গ্রামের নৌকার ঘাটে ইঞ্জিনচালিত নৌকার পাশাপাশি ছোট ছোট ডিঙিনৌকা পাওয়া যায়। এখান থেকে কুন্দইল সেতু পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া ২০ টাকা এবং পুরো নৌকা ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া নেওয়া যায় ১০০ থেকে ২০০ টাকার বিনিময়ে।
বিলের পরিবেশ এখন উৎসবমুখর। কেউ পানিতে গোসল করছেন, কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে পানির ধারে অবস্থান করছেন, আবার অনেকে মাকড়শোন এলাকা পর্যন্ত যানবাহনে গিয়ে সেখান থেকে নৌকায় চড়ে বিলের ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাড়াশ সদর এলাকার চাকরিজীবী হারুনার রশিদ বলেন, "বর্ষায় বিলে পানি এলেই তিনি মেয়েকে নিয়ে এখানে ঘুরতে আসেন।"
কুন্দইল সেতুর ঘাটে পৌঁছালে দেখা যায় নৌকার সারি আর মাঝিদের ব্যস্ততা। সেতুর রেলিং থেকে অনেকে পানিতে ঝাঁপ দিচ্ছেন, কেউ মুঠোফোনে ছবি ও ভিডিও তুলছেন, আবার কেউ কেবল দাঁড়িয়ে জলরাশির সঙ্গে সবুজের মিতালি উপভোগ করছেন। স্থানীয় মাঝি আবদুস সালাম জানান, বর্ষায় তার ব্যস্ততা বহুগুণ বেড়ে যায়। তিনি বলেন, "দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একের পর এক যাত্রী পারাপার ও নৌকাভ্রমণ করাতে হয়। এই মৌসুমের বাড়তি আয়েই সংসারে কিছুটা স্বস্তি ফেরে।"
বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার ব্যবসায়ী ছোটন চক্রবর্তী পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে চলনবিলে ঘুরতে এসেছেন। তিনি বলেন, “নৌকাভ্রমণ আর চারপাশের প্রকৃতি আমাকে মুগ্ধ করেছে।” তার মেয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী টুসু চক্রবর্তী প্রথমবার চলনবিল দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে জানায়, নৌকায় ভেসে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরে সে খুব খুশি।
স্থানীয়দের মতে, আষাঢ় ও শ্রাবণ মাস চলনবিল ভ্রমণের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। তবে পানির স্তরের ওপর নির্ভর করে ভাদ্র ও আশ্বিন মাস পর্যন্ত দর্শনার্থীদের আনাগোনা থাকে। এবার পর্যাপ্ত পানি এবং তাড়াশ সদর থেকে কুন্দইল পর্যন্ত সড়কের অবস্থার উন্নতির ফলে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বিলপাড়ে ভাজাপোড়া, চা ও ফলের অস্থায়ী দোকানের মাধ্যমে মৌসুমি ব্যবসাও জমে উঠেছে।
দর্শনার্থীদের এই ভিড় চলনবিলের পর্যটন সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। লেখক ও গবেষক এবং খুলনার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত পরিচালক খ ম রেজাউল করিম মনে করেন, চলনবিলের এই অংশকে ঘিরে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে এখানে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটতে পারে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এদিকে, চলনবিলে ভ্রমণে আসা মানুষের সুবিধার্থে কী কী উদ্যোগ নেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ করছে উপজেলা প্রশাসন বলে জানান তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান।