যুক্তরাষ্ট্রের ৮০টিরও বেশি দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত এই নতুন শুল্ক কার্যকর করা হয়। মার্কিন প্রশাসন ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ৩০১ ধারার বরাত দিয়ে এই পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। তবে শুল্কের আওতায় পড়া অধিকাংশ দেশই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্যঘাটতি কমানোই ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। তবে এই নীতি আইনি জটিলতার মুখে পড়েছে; এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর পাল্টা শুল্ক নীতিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল। বৃহস্পতিবার রাতে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই এই নতুন শুল্ক কার্যকর করায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
এই পদক্ষেপের বিপরীতে বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া নিম্নরূপ:
অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ডন ফ্যারেল জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে দেশটির সম্পৃক্ততার অভিযোগ নাকচ করে জানিয়েছেন, গরুর মাংস, স্বর্ণ ও তামার বড় রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া আধুনিক দাসত্বের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। তিনি বলেন, "শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাবে।"
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন এই সিদ্ধান্তকে ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, "যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে জোরপূর্বক শ্রমসংক্রান্ত অভিযোগের পক্ষে অর্থবহ প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।"
যুক্তরাজ্য সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, নতুন মার্কিন শুল্কের ফলে তাদের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না, কারণ পূর্বের বাণিজ্যচুক্তির আওতায় কিছু শিল্প খাত অব্যাহতি পেয়েছে। তিনি বলেন, "বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় যুক্তরাজ্যের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যেন জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি না করে, সে বিষয়টি তারা অত্যন্ত গুরুত্বসহ দেখে। যুক্তরাষ্ট্রও যুক্তরাজ্যের গৃহীত পদক্ষেপের কথা স্বীকার করেছে। তাই নতুন ঘোষণার আওতায় যুক্তরাজ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়নি।"
জাপানের প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, "জাপানে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা নেই—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে শুল্ক আরোপ করা দুঃখজনক। কেননা জাপানের শিল্প ও বাণিজ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হয়।" তিনি আরও জানান, গত বছরের বাণিজ্যচুক্তি অনুযায়ী জাপানি পণ্যে মোট শুল্কহার ১৫ শতাংশের বেশি হবে না বলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তারা নিশ্চিত হয়েছেন।
ইউরোপীয় কমিশন কিছুটা আশাবাদী। তাদের মতে, নতুন এই নীতি যুক্তরাষ্ট্র-ইইউর আগের বাণিজ্য সমঝোতা থেকে বিচ্যুত হয়নি। কমিশনের এক মুখপাত্র বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ বিবৃতিতে যে শুল্ক-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, এই নীতি তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।"
অন্যদিকে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ নতুন শুল্কের নিন্দা জানিয়ে একতরফা শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থানের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, "শুল্কযুদ্ধ ও বাণিজ্যযুদ্ধে কোনো পক্ষেরই স্বার্থ রক্ষা হয় না।" উল্লেখ্য, গত মে মাসের আলোচনার ধারাবাহিকতায় আগামী সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতে এই শুল্ক নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানিকারকেরা। কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান অশ্বিন চন্দ্রন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা দিয়ে তৈরি পণ্যের শুল্ক ছাড়ের তালিকায় ভারত নেই। তিনি বলেন, "এ ধরনের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে ভারতের বস্ত্র ও পোশাক খাত আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ হারাতে পারে। অর্থাৎ সেগুলো অন্য দেশে চলে যাবে, এমন সম্ভাবনা আছে।"