সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আরেক আসামি রাকিবুল হাসানকে কারাফট জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় এই মামলাটি দায়ের করা হয়।

আজ শুক্রবার বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. রিপন হোসেন শুনানি শেষে এই আদেশ প্রদান করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হুদা আসামিকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানালেও আদালত তা নাকচ করে দেন। পরিবর্তে তাঁকে কারাফট জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, শুনানির সময় আসামিপক্ষের কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। অসুস্থতার কথা বিবেচনা করে আদালত রিমান্ডে না পাঠিয়ে কারাফট জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন।

রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা রাকিবুল হুদা উল্লেখ করেন, মামলার মূল রহস্য উদ্‌ঘাটন, ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং ১ নম্বর আসামি গাজী নজরুল ইসলাম ও বাদীর ভাগনিকে নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও উদ্ধারের জন্য রাকিবুল হাসানকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

এর আগে অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ এবং ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে বাদীকে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা এই মামলায় গত বুধবার আমিনুর রহমান নামে আরেক আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, বাদী ওবায়দুর রহমান রাজধানীর পল্লবীর কালশী এলাকার ‘রোজগার্ডেন টাওয়ার’-এ তাঁর বোনের বাসায় থাকতেন এবং তিনি গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আত্মীয়তার সূত্রে নজরুল ইসলামের ওই বাসায় যাতায়াত ছিল তাঁর। একপর্যায়ে ওবায়দুরের ভাগনির সঙ্গে নজরুল ইসলামের অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

সম্পর্কের বিষয়ে ওবায়দুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “গাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ভাগনির বাবার আপন খালু। সেই হিসাবে সম্পর্কে তিনি ওই তরুণীর নানা হন।”

এজাহারে আরও বলা হয়, অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে ওবায়দুর তাঁর পরিবারকে জানান এবং নজরুল ইসলামকে ওই সম্পর্ক থেকে সরে আসার অনুরোধ করেন। এরপর থেকেই তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, সম্প্রতি মগবাজারের একটি চক্র নজরুল ইসলাম ও ওই তরুণীর কিছু ‘অপ্রীতিকর ভিডিও’ সংগ্রহ করে তাঁকে ব্ল্যাকমেল করতে থাকে। এতে নজরুল ইসলামের সন্দেহ হয় যে, ওবায়দুরই গোপনে ভিডিও ধারণ করে সংবাদমাধ্যম ও ওই চক্রের কাছে দিয়েছেন। সেই সন্দেহের বশেই ১৪ জুলাই তাঁর নির্দেশে অন্য আসামিরা ওবায়দুরের ওপর হামলা চালান।

বাদী ওবায়দুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন বেলা ১১টার দিকে আমিনুর রহমান কৌশলে তাঁকে বাসার ড্রয়িংরুমে ডেকে নেন। সেখানে অন্য আসামিদের সঙ্গে নিয়ে লাঠি দিয়ে তাঁকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। একপর্যায়ে আমিনুর তাঁকে মেঝেতে ফেলে গলা চেপে শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা করেন। এ সময় তাঁর মা তাহমিনা ও ছোট বোন মীম চিৎকার করলে হামলাকারীরা পালিয়ে যান। পরে আহত অবস্থায় তিনি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

এজাহারে ওবায়দুর রহমান আরও অভিযোগ করেন, হামলার পর থেকে আসামিরা তাঁকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন এবং নিরাপত্তাহীনতায় তিনি বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন।

গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। গত সোমবার রাতে ওই তরুণীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাঁকে তরুণীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যায়।

ভিডিও প্রকাশের পর জামায়াতের অনেক নেতা-কর্মী সেটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে তৈরি বলে দাবি করলেও, গত মঙ্গলবার দুপুরে গাজী নজরুল ইসলাম নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দিয়ে জানান, ওই তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়াম বেগম। ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং তাঁর প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে ঢাকায় মরিয়াম বেগমের বাবা মাসুম বিল্লাহর বাসভবনে বিয়ে সম্পন্ন হয় বলে তিনি জানান।

তবে এই ঘটনা তদন্ত করে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘নৈতিক স্খলনের’ জন্য গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একইসঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।