মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ফলভর্তি কমলাগাছ কেটে ফেলার ঘটনায় আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে প্রশাসন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছে কমিটি।
কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমান। অপর দুই সদস্য হলেন সিলেট বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. আবদুর রহমান এবং মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোসা. শাহীনা আক্তার। তাঁরা গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি রেঞ্জের অধীন আদমপুর বিটের কালিঞ্জি এলাকায় কেটে ফেলা কমলাবাগানটি পরিদর্শন করেছেন। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তদন্ত কাজ করেন তাঁরা।
.গতকাল আমাদের এলাকায় কর্মকর্তারা এসেছিলেন। তাঁরা আলীম উল্লাসহ পরিবারের লোকজন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলেছেন। আমাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েছেন। শিগগরই তদন্ত রিপোর্ট দিবেন বলে জানিয়েছেন। আমরা সব ঘটনা কর্মকর্তাদের খুলে বলেছি।সলিম উল্লা, বাগানটি গড়ে তোলা আলীম উল্লার ভগ্নিপতি
এ সময় কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিয়াজ মাহমুদ, কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সার্কেলের অতিরিক্তসহ বন বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের তদন্ত কমিটির প্রধান আশরাফুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, গাছ কাটার ঘটনায় বিভাগীয় কমিশনার তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। তদন্তের অংশ হিসেবে কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। সংগৃহীত বক্তব্য এবং তথ্য-উপাত্ত সমন্বয়ে একটা প্রতিবেদন তৈরি করে যথাসময়ে দ্রুতই সরকারের কাছে দাখিল করা হবে। তারপরে সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
.ফলভর্তি হাজার কমলাগাছ কাটা হলো উচ্ছেদ অভিযানে.এদিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই ঘটনার খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান ও অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাঁরা ধরেননি।
তবে কমলগঞ্জের ইউএনও মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিভাগীয় কমিশনার ও ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে সম্ভবত যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে আমাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরাসরি কোনো যোগাযোগ হয়নি। গতকাল তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়েছে।’
এর আগে গত ১৬ জুলাই কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি রেঞ্জের অধীন আদমপুর বিটের কালিঞ্জি এলাকায় উপজেলা প্রশাসন, বন বিভাগ ও পুলিশের যৌথ অভিযানে প্রায় পাঁচ একর সংরক্ষিত বনভূমি দখলমুক্ত করা হয়। বন বিভাগের দাবি, সেখানে অবৈধভাবে কমলার বাগান, একটি পুকুর এবং বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছিল। অভিযান চালিয়ে সেগুলো অপসারণ করে জমি পুনরায় বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
.ওই অভিযানে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ফল ধরা কমলাগাছ কেটে ফেলার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য আলীম উল্লার দাবি, আট বছরের শ্রম ও ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা বাগানটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগও তুলেছে। পরিবারটির সদস্যদের ভাষ্য, চাঁদা না দেওয়ায় ফল তোলার আগেই বাগান কেটে ফেলা হয়েছে।
অন্যদিকে বন বিভাগ চাঁদা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, সংরক্ষিত বনভূমিতে ব্যক্তিগতভাবে কমলা, মাল্টা, আনারস বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক বাগান করা সম্পূর্ণ বেআইনি। বনভূমি দখলমুক্ত করার নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবেই উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
.তদন্তে ঘটনার বিস্তারিত ওঠে আসবে বলে আশাবাদী ভুক্তভোগী পরিবারের। আলীম উল্লার ভগ্নিপতি সলিম উল্লা বলেন, ‘গতকাল আমাদের এলাকায় কর্মকর্তারা এসেছিলেন। তাঁরা আলীম উল্লাসহ পরিবারের লোকজন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলেছেন। আমাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েছেন। শিগগরই তদন্ত রিপোর্ট দিবেন বলে জানিয়েছেন। আমরা সব ঘটনা কর্মকর্তাদের খুলে বলেছি।’