টানা কয়েক দফার ভারী বৃষ্টিতে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জেলার বাজারগুলোতে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে সবজির দাম।

গত দুই সপ্তাহে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে কাঁচামরিচ ও শসার। একই সঙ্গে মাছ ও ব্রয়লার মুরগির দামও বাড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ।

শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকাল থেকে জেলার বেউথা বাজার, নয়কান্দি বাজার, পৌর কাঁচাবাজার, ডায়াবেটিস হাসপাতালসংলগ্ন বাজার এবং জাগীর বন্দর আড়ত ঘুরে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হওয়া বেশির ভাগ সবজিই এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। এর মধ্যে বেগুন, করলা, চিচিঙ্গা, ঢ্যাঁড়শ ও পটল বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে। শসার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকায়। এ ছাড়া পেঁপে, লাউ ও চালকুমড়াসহ অন্যান্য সবজির দামও ঊর্ধ্বমুখী। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে কাঁচামরিচের বাজারে। কয়েক দিন আগেও ৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া কাঁচামরিচ এখন বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকায়।

পৌর কাঁচাবাজারে কেনাকাটা করতে আসা জসিম উদ্দিন বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগেও যে টাকায় পুরো এক সপ্তাহের সবজি কেনা যেত, এখন সেই টাকায় দুই-তিন দিনের বেশি চলে না। বিশেষ করে কাঁচামরিচ, বেগুন, শসাসহ অন্যান্য সবজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

আরেক ক্রেতা ফারুক হোসেন বলেন, সবজির পাশাপাশি মাছ ও মুরগির দামও বেড়েছে। বাজারে এসে প্রয়োজনীয় সব জিনিস কেনা সম্ভব হচ্ছে না, বাধ্য হয়ে কম পরিমাণে কিনে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। বাজার তদারকি আরও জোরদার করা দরকার।

বেউথা বাজারের খুচরা বিক্রেতা ইমারত আলী জানান, পাইকারি আড়তেই সবজির দাম বেড়েছে। ফলে বেশি দামে কিনে খুচরা বাজারেও বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে।

জাগীর বন্দর আড়তের আড়তদার মোশাররফ হোসেন বলেন, টানা বৃষ্টিতে মাঠের সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গেছে। যে কারণে বাধ্য হয়েই বেশি দামে সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে।

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের রাজিবপুর গ্রামের সবজি চাষি মিশুক গাজী বলেন, টানা বৃষ্টিতে আমার পেঁপে, শসা ও করলার ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। যে পরিমাণ ফলন হওয়ার কথা ছিল, তার বড় অংশই আর পাওয়া যাবে না। উৎপাদন খরচও উঠবে না, বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ বলেন, টানা বৃষ্টিতে মানিকগঞ্জে ২৪১ একর জমির সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে জেলার পাইকারি ও খুচরা বাজারে।

এদিকে সবজির পাশাপাশি মাছের বাজারেও আগুন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে নদী ও সাগরে মাছ ধরা কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমেছে। ফলে ভরা মৌসুমেও ইলিশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

মানিকগঞ্জ মাছ বাজারের তসলিম মিয়া বলেন, বৈরী আবহাওয়ায় নদী ও সাগরে মাছ ধরা কমে যাওয়ায় সরবরাহ কমেছে। বর্তমানে রুই ৪৬০ টাকা, কাতল ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা, বড় চিংড়ি ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা এবং এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ প্রায় তিন হাজার টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। তবে সাগরের ইলিশের সরবরাহ বাড়লে মাছের দাম কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করছি।

অন্যদিকে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। তবে ডিমের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন ক্রেতারা।

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মানিকগঞ্জের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বে) আসাদুজ্জামান রুমেল বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে উৎপাদন ও সরবরাহে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তবে কেউ যেন এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াতে না পারে, সে বিষয়ে আমাদের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোথাও অনিয়ম বা অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে এবং ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে আবার উৎপাদন শুরু হলে বাজারে সবজির সরবরাহ বাড়বে। ততদিন পর্যন্ত বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক দামে পণ্য বিক্রির আহ্বান জানানোর পাশাপাশি নিয়মিত বাজার তদারকি অব্যাহত থাকবে।