দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি এবং এক ক্যানটিনকর্মীর বিরুদ্ধে ছাত্রীদের গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগের বিচার দাবিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে দাবিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নের আশ্বাস না পাওয়ায় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিচালিত ‘Tow Two’ নামক ফেসবুক পেজে বৃহস্পতিবার রাতে ‘সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’ প্যাডে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি উত্থাপন করলেও প্রশাসন আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করে কোনো দাবিই তাৎক্ষণিকভাবে মেনে নেয়নি। ফলে দাবিগুলোর বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে তাঁদের বৈঠক হয়। তবে সেই বৈঠকে দাবিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নের আশ্বাস না পাওয়ার অভিযোগ তুলে রাতে একাডেমিক ভবনগুলোর পাশাপাশি প্রশাসনিক ভবনেও নতুন করে তালা ঝুলিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা।
বৈঠকে উত্থাপিত তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—বিজয় ’২৪ হলের ছাত্রীদের ভিডিও ধারণের অভিযোগে অভিযুক্ত ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসানের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্ট বডিকে জবাবদিহির আওতায় আনা; যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রুবেল আনছার ও অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামকে অতিদ্রুত স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা; এবং সম্প্রতি গঠিত ‘স্পন্দন-২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিল করা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লাবটি গঠনের প্রক্রিয়া ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, "প্রশাসন দাবিগুলোর বিষয়ে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে সময়ক্ষেপণ করেছে।" তাঁদের ভাষ্য, "কার্যকর পদক্ষেপের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।"
এদিকে গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দিনভর একাধিক জরুরি সভা করেছে। সভায় অভিযুক্ত ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসান ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে হরিণটানা থানায় মামলা করার বিষয়টি জানানো হয়। একই সঙ্গে ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন, অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচালিত ক্যানটিনের বরাদ্দ বাতিল, হলের ভেতর কর্মচারীদের মুঠোফোন বহন নিষিদ্ধ, অপরাজিতা ও বিজয় ’২৪ ছাত্রী হলে পুরুষ কর্মী নিয়োগ না দেওয়া এবং ক্যানটিন পরিচালনায় কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে রিভিউ আবেদন পাওয়া সাপেক্ষে পুনঃতদন্তের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের সাময়িক বরখাস্ত শিক্ষক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে চলমান দুটি তদন্ত কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি চলতি টার্মের নিবন্ধনের সময় ৪ আগস্ট পর্যন্ত জরিমানা ছাড়া এবং ১১ আগস্ট পর্যন্ত জরিমানাসহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, বুধবার রাতে বিজয় ’২৪ হলের ছাত্রীদের শৌচাগার ও গোসলখানার ভেন্টিলেটর দিয়ে গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগে ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসানকে আটক করেন শিক্ষার্থীরা, যাকে পরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। এই ঘটনায় তাঁর স্ত্রীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর আগে, গত ১৮ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে মেসেঞ্জারে অশালীন বার্তা পাঠানো ও কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁকে ডিসিপ্লিন প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি দেয় এবং যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রের গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি বিষয়টি তদন্ত করছে। এছাড়া গত বছরের আগস্টে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে দুই ছাত্রীর যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। তদন্ত শেষে গত ২৮ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় একটি অভিযোগ থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং অন্য অভিযোগে তাঁকে দুই বছরের জন্য পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণসহ সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।