চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি সংরক্ষিত বনের প্রায় ৮ একরের একটি বাঁশবাগান উজাড় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এই বাঁশবাগানটি বন্য হাতির খাদ্যের অন্যতম প্রধান উৎস। বন গবেষক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস ধ্বংস হলে হাতি খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে প্রবেশ করবে, যার ফলে মানুষ ও হাতির সংঘাত আরও তীব্র হবে।

লোহাগাড়া উপজেলা সদর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক হয়ে ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে চুনতি হাজী রাস্তার মাথা এলাকা। সেখান থেকে গ্রামীণ সড়ক ধরে নয়াপাড়া এলাকায় একটি টিলা অবস্থিত, যা স্থানীয়দের কাছে 'বাঁশবাগান পাহাড়' নামে পরিচিত। প্রায় ৮ একর আয়তনের এই পাহাড়ের বাঁশ একটি সিন্ডিকেট কেটে ফেলছে বলে জানা গেছে।

গত মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড়টির দক্ষিণ পাশে প্রায় এক একর জায়গা সম্পূর্ণ উজাড় করে পরিষ্কার করা হয়েছে এবং গাছপালা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ওই স্থানে হাতির বিষ্ঠা ও পায়ের ছাপ স্পষ্ট দেখা গেছে। স্থানীয়দের মতে, তিন দিন আগেও কচি বাঁশ খেতে এখানে বুনো হাতির দল এসেছিল। বনের একাংশে বাঁশ ও গাছ কেটে ফেলার চিহ্ন এখনো বিদ্যমান; কোথাও বাঁশ গোড়াসহ তুলে নেওয়ায় গর্ত তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও গাছের গুঁড়ির নিচের অংশ রয়ে গেছে। ড্রোন দিয়ে তোলা ছবিতেও বন থেকে গাছ কাটার দৃশ্য স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় পুরো বনটি বাঁশঝাড়ে পরিপূর্ণ ছিল। তবে তিন বছর আগে থেকে ধীরে ধীরে বাঁশঝাড় উজাড় করে বনজ গাছ রোপণের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে যে অংশটি উজাড় করা হয়েছে, সেখান থেকে বাঁশ কেটে গাড়ি ভর্তি করে অন্যত্র বিক্রি করা হয়েছে। সংলগ্ন বাকি বাঁশঝাড়গুলোও একইভাবে উজাড় হতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনজন স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তকণ্ঠকে জানান, “স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কালামের নেতৃত্বে প্রায় আট সদস্যের একটি সিন্ডিকেট বাগানটি উজাড় করছেন। গত রোববার ছয়জন শ্রমিক দিয়ে বাগানের একাংশ উজাড় করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পুরো বাগানটি উজাড় করে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে বনজ গাছ রোপণ করার পরিকল্পনা আছে সিন্ডিকেটটির।”

এই বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কালাম জানান, তিনি জায়গাটি চেনেন না এবং সেটি তার এলাকায় নয়। কথা বলার মাঝেই তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং পরবর্তীতে আর ফোন ধরেননি।

বন গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মো. কামাল হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বাঁশ হাতির গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এ ধরনের বাঁশবাগান উজাড় হলে হাতি খাদ্যের সন্ধানে লোকালয় ও মানুষের কৃষি জমিতে ঢুকে পড়বে। এতে হাতি-মানুষ সংঘাত আরও বাড়বে।”

বাঁশবাগান পাহাড়টি চুনতি রেঞ্জের সাতগড় বনবিটের অধীনে। বিট কর্মকর্তা বজলুর রশীদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ওই পাহাড়ে বন বিভাগ ২০০৪ সালে বাঁশ বাগান তৈরি করেছিল। আমি এখানে যোগদান করেছি ২ মাস আগে। দীর্ঘ সময় সময় ধরে যারা বাঁশ বাগান উজাড় করে বাণিজ্যিক বাগান সৃজন করছে তাদের ব্যাপারে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কিনা সেই ব্যাপারে আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। এখন আমরা অভিযান চালিয়ে বাণিজ্যিকভাবে লাগানো গাছগুলো উচ্ছেদ করব এবং সেখানে পুনরায় বাঁশ রোপণ করে বাগানটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনব। একই সঙ্গে উজাড় কাজে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেব।”