জি কে এম লুৎফর রহিম (লুল্টু) ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় পা রাখলে মনে হবে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছেন। যেখানে থরে থরে সাজানো আরবি ক্যালিগ্রাফির প্রাচীন সুলতানি আমলের গোলাকার ও চারকোনাকৃতির মৌর্য যুগের বিনিময় মুদ্রা। যে মুদ্রা হাতে নিলেই মন চলে যায় ইতিহাসের গভীরে। শুধু ইন্দো-গ্রিক মুদ্রা নয়, এই সংগ্রহশালায় আছে শতাধিক দেশের প্রাচীন ও বর্তমান মুদ্রা।
যশোর শহরের বিমানবন্দর সড়ক এলাকায় লুৎফর রহিমের বাড়ি। তাঁর বাড়ির নিচতলার চারটি কক্ষজুড়ে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘লুল্টুর সংগ্রহশালা’। স্থানীয়ভাবে সেটি জাদুঘর নামেও পরিচিত। টেরাকোটা, কলের গান, ডাকটিকিট, হাতির দাঁত, হরিণের মাথা, হুঁকা, তরবারিসহ শতাধিক প্রাচীন জিনিসপত্র ঠাঁই পেয়েছে তাঁর সংগ্রহশালায়। তবে এসব ছাপিয়ে তাঁর মুদ্রার সংগ্রহ বিশেষভাবে সমাদৃত।
বেলজিয়াম, কঙ্গো, গাম্বিয়া, ফিলিস্তিন, জাম্বিয়া, চাদ, মালি, মাল্টা, ইথিওপিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, ঘানা, মিয়ানমার, জ্যামাইকা, দক্ষিণ সুদান, সুদান ও ত্রিনিদাদ ও টোবাগোসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা তাঁর সংগ্রহশালায় আছে।
সম্প্রতি সংগ্রহশালাটি ঘুরে দেখেছেন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) আ ন ম মোস্তাদুদ দস্তগীর। তিনি জানান, মুদ্রা দেখলে প্রাচীন অর্থনৈতিক অবস্থা, অর্থনৈতিক বিনিময়ের ইতিহাস তথা বিভিন্ন দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা যায়। বিদেশি পর্যটকদের জন্য সংগ্রহশালাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদেশিরা এ দেশে শপিং মল, মার্কেট দেখতে আসেন না। তাঁরা ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে আসেন।
মুদ্রার প্রতি প্রবল আগ্রহ থেকেই ১৯৯০ সালে লুৎফরের এই মুদ্রা সংগ্রহ শুরু হয়। ১৯৯৪ সালে যশোর শহরের সোনাপট্টি সড়কের জনপ্রিয় জুয়েলার্স নামে একটি সোনার গয়নার দোকান থেকে সুলতানি আমলের দুটি মুদ্রা সংগ্রহ করেন তিনি। কুষ্টিয়ার সোনার দোকান থেকেও তিনি রুপার মুদ্রা সংগ্রহ করেন। তাঁর বেশির ভাগ আত্মীয়স্বজন প্রবাসী। তাঁদের কাছে অনেক স্বজনের অনেক ধরনের আবদার থাকে। তবে লুৎফরের আবদার ভিন্ন। তিনি তাঁদের কাছে সে দেশের একটা করে মুদ্রা আবদার করেন। স্বজনেরাও তাঁর আবদার পূরণে সাড়া দেন। এভাবেই তিনি বিভিন্ন দেশের মুদ্রা সংগ্রহ করেছেন।
লুৎফর একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। চাকরির সুবাদে তিনি বগুড়া, রাজশাহী, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছিলেন। বর্তমানে তাঁর কর্মস্থল যশোরেই। তিনি যেখানেই প্রাচীন জিনিসপত্র দেখেন, তা সংগ্রহের চেষ্টা করেন। টাকায় কিনে হোক বা সম্পর্কের বিনিময়ে প্রাচীন মুদ্রাগুলো সংগ্রহ করেন। সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সালের ছবিসংবলিত স্মারক মুদ্রা কিংবা রানির ছবিসংবলিত মুদ্রাও আছে।
সম্প্রতি সংগ্রহশালায় গিয়ে দেখা গেল, সাজানো প্রাচীন সব নিদর্শন। টেরাকোটা ও নকশাকাটা ইট নজর কাড়ছে। দুটি প্রাচীন মুদ্রার মরিচার আস্তরণ ভেদ করে জানান দিচ্ছে সুলতানি আমলের ক্ষয়ে যাওয়া আরবি ক্যালিগ্রাফি।
যশোর জেলা তথ্য কর্মকর্তা এলিন সাঈদ-উর রহমান বলেন, ধাতব মুদ্রাগুলো মনে করিয়ে দেয় প্রাচীন মৌর্য, সুলতানি ও পাল বংশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা। তখনকার রাজা-বাদশাহ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। ছোটবেলায় তাঁরা ফুটো পয়সার কথা শুনতেন। সংগ্রহশালায় তিনি প্রাচীন ফুটো পয়সা হাতে নিয়ে দেখেছেন।
মোগল সাম্রাজ্য নেই, কিন্তু সাম্রাজ্যের ধাতব মুদ্রা এখনো রয়ে গেছে তাঁর সংগ্রহশালায়। ১৭৮০ ও ১৮০০ সালের তৈরি একপাই সিককা, ফুটো পয়সা, কানাপাইসহ অনেক দেশের হাজার রকমের প্রাচীন ও বর্তমান মুদ্রা আছে তাঁর সংগ্রহশালায়। এসব মুদ্রা তামা, পিতল, অ্যালুমিনিয়াম, লোহা, রুপা ও মিশ্র ধাতু দিয়ে তৈরি।
লুৎফর রহিম বলেন, প্রাচীন মুদ্রার প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ আছে। মুদ্রা শুধু একটি মুদ্রা নয়, একটি মুদ্রার মধ্যে লুকিয়ে থাকে গোটা সময়ের ইতিহাস। মুদ্রাটি কোন রাজা-বাদশাহর শাসনামলের, কোন সালের, সেই সময়ের ভাষা সবই ওই মুদ্রার মধ্যে লিপিবদ্ধ থাকে। ওই মুদ্রার সূত্র ধরে তখনকার ইতিহাসের পথে হাঁটা যায়। এ জন্য মুদ্রা তাঁকে ভীষণ টানে। তাঁর মুদ্রা সংগ্রহের ইতিহাস ৩৬ বছরের। এ সময়ের মধ্যে বিভিন্ন সোনার দোকান, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে মুদ্রাগুলো সংগ্রহ করেছেন। তাঁর সংগ্রহশালায় শতাধিক দেশের মুদ্রা যেমন আছে; তেমনি বিলুপ্ত ছয়টি দেশের মুদ্রাও আছে।
মুদ্রা সংগ্রহের এই নেশা তাঁকে নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছে। একবার সাতক্ষীরার এক দোকানির কাছে তিনি প্রাচীন মুদ্রার সন্ধান পান। সেই মুদ্রা পাওয়ার জন্য লুৎফর যখন দোকানির সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন দোকানি তাঁকে অবাক করে দিয়ে বলেন। তিনি নিজেই লুৎফরের সব মুদ্রা পাঁচ লাখ টাকায় কিনে নিতে চান। বিনীতভাবে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন লুৎফর। তাঁর কাছে এই মুদ্রাগুলো কেবল ধাতুর টুকরা নয়, এগুলো তাঁর জীবনের অমূল্য সম্পদ।
একবার বাগেরহাটের এক ব্যক্তির কাছ থেকে আফ্রিকা মহাদেশের চাদ নামে দেশের একটি মুদ্রা সংগ্রহ করতে ৭ থেকে ৮ বার তাঁর বাড়িতে যান লুৎফর। পরে দুই হাজার টাকা খরচ করে সেই মুদ্রাটি সংগ্রহ করেন তিনি।
লুৎফর রহিম বলেন, নতুন প্রজন্মকে শুধু প্রযুক্তির নেশায় পড়ে থাকলে চলবে না, মুদ্রা সংগ্রহের মতো সৃজনশীল ও জ্ঞানভিত্তিক কাজেও তরুণদের এগিয়ে আসা উচিত। শখ কেবল সময় কাটানোর মাধ্যম নয়, শখ মানুষের জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর অন্যতম উপায়ও হতে পারে।
শিগগিরই সংগ্রহশালাটি দেখতে যাবেন বলে জানান যশোর জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে বিভিন্ন সময় এ বিষয়ে তথ্য জানতে চাওয়া হয়। তিনি সংগ্রহশালাটির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তথ্য জানাবেন বলে জানান।