২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন মাদারীপুর-শরীয়তপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের একটি অংশ কয়েক মাসের মধ্যেই খানাখন্দে পরিণত হয়েছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, উঠে গেছে বিটুমিন ও পাথর, এমনকি কোথাও কোথাও ঢালাই ভেঙে বেরিয়ে এসেছে রড। ফলে প্রতিদিন চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজার হাজার মানুষ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২৫ কোটি ১০ লাখ ৮২ হাজার টাকা ব্যয়ে মাদারীপুর সদর থেকে মস্তফাপুর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘অরিয়েন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেড’ (টেন্ডার আইডি: ১১৭৬২৯১)। চলতি বছরের মার্চে নির্মাণকাজ শুরু হলেও কয়েক মাসের মধ্যেই সড়কের বিভিন্ন অংশে মারাত্মক ত্রুটি দেখা দেয়। নভেম্বরে পুরো কাজ শেষ হওয়ার কথা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ইটেরপুল বাজার এলাকায় ঢালাইয়ের শুরু ও শেষাংশ মিলিয়ে অন্তত ২৫টি স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। এছাড়া কাজীর মোড়, কলেজ মোড় এবং থানা রোড সংলগ্ন অংশে বিটুমিন উঠে গিয়ে সড়ক অসমান ও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টির পানি জমে গর্তগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ রূপ নিয়েছে; ফলে ভারী যানবাহন চলাচলের সময় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার ও তদারকির চরম ঘাটতির কারণেই অল্প সময়ের মধ্যে সড়কটির এই বেহাল দশা হয়েছে। ইটেরপুল এলাকার বাসিন্দা আবদুল মোমিন বলেন, শুরুতেই কাজের মান নিয়ে আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা আমাদের কথা গুরুত্ব দেননি। এখন সেই অব্যবস্থাপনার ফল পুরো এলাকার মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী টুটুল বলেন, নির্মাণকাজ চলার সময়েই একাধিকবার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন কোটি কোটি টাকার সরকারি এই সড়কের স্থায়িত্ব ও মান নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় আলিম মাতুব্বর, সোহেল মাতুব্বর ও ইমাম হাওলাদারসহ একাধিক বাসিন্দা দাবি করেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতার কারণেই সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি। তারা পুরো প্রকল্পের গুণগত মান ও অনিয়ম যাচাইয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি জানান।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অরিয়েন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেডের স্বত্বাধিকারীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিনিধি দাবি করেন, সড়কের মেরামতকাজের কথা বলে সড়ক বিভাগের কিছু কর্মকর্তা তাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
এদিকে তীব্র সমালোচনার মুখে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকাল থেকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ বিটুমিন, বালু ও ইট দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোতে সাময়িক মেরামতের কাজ শুরু করেছে। তবে স্থানীয়দের মতে, এটি স্থায়ী সমাধান নয়; বরং মূল অনিয়ম ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা মাত্র।
মাদারীপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খ ম নকিবুল বারী বলেন, প্রকল্পের কাজের মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। বৃষ্টির কারণে কিছু স্থানে খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সাময়িক মেরামতের কাজ চলছে। প্রকল্পের শুরুতে আমি দায়িত্বে ছিলাম না, তাই মূল নির্মাণকাজের মান নিয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।