দরপত্র ছাড়া সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে প্রায় ১৬ লাখ টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া কিছুটা পিছিয়ে গেছে। বুধবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিই) বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে এই আমদানির নীতিগত অনুমোদন পাওয়া সম্ভব হয়নি।
গণখাতে ক্রয় বিধির (পিপিআর) নিয়ম অনুযায়ী, সরাসরি কেনাকাটার ক্ষেত্রে সিসিই-র নীতিগত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বাস্তবায়নকারী এই ১৫টি প্রস্তাবের জন্য মোট ১৭ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ ছিল। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কয়েক দিন আগেই এই প্রস্তাবগুলোর কাগজপত্র মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছিল।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের সাথে এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। তবে গতকাল রাতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, তিনি সোনারগাঁও হোটেলের একটি অনুষ্ঠানে ছিলেন। সেখান থেকে সিসিই-র বৈঠকে অংশ নিতে রওনা দিলেও ট্র্যাফিক জ্যামের কারণে সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি।
আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে অনেক কম দর প্রস্তাব এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের নতুন হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘কেউ যাতে বলতে না পারে, এ কারণে আমরা সবাইকেই সুযোগ দিতে চেয়েছি।’ প্রস্তাবগুলো পুনরায় উপস্থাপনের বিষয়ে তিনি জানান, ‘কাল বা পরশু (আজ বা আগামীকাল) সময় চেয়ে নেব। নীতিগত অনুমোদন ভার্চ্যুয়ালও হতে পারে।’
প্রস্তাবগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের ফলে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশে জরুরি জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর দরপ্রস্তাব যাচাই-বাছাই ও দর-কষাকষির পর বিপিসি সেগুলোকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওমান, নাইজেরিয়া, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং, কাজাখস্তান, দুবাই ও চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ডিজেল কেনার কথা ছিল। এর মধ্যে একটি প্রস্তাবে ১ লাখ ২৫ হাজার টন, একটিতে ৫০ হাজার টন এবং বাকি ১৩টি প্রস্তাবে ১ লাখ টন করে ডিজেল আমদানির প্রস্তাব দেওয়া হয়। আমদানিকৃত ডিজেলের মূল্য বিল অব লেডিং তারিখের প্ল্যাটস (আরব গালফ) দরের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ও আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার কারণে পরিবর্তিত হতে পারে।
ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে কম ব্যয় ধরা হয়েছে ওমানভিত্তিক এনার্জি মাল্টিনেক্স কনভারেন্স টেকনোলজিস এলএলসি-র কাছ থেকে ৫০ হাজার টন ডিজেল কেনায় (৬৬৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা)। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক একেএ এনার্জি লিমিটেডের কাছ থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার টন ডিজেল কেনায় সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৭০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
অন্যান্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে নাইজেরিয়াভিত্তিক প্যাসিফিক সিলভারলাইন লিমিটেড (১ হাজার ২২৫ কোটি ৪৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা), অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক টোটাল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল (১ হাজার ২৮৩ কোটি ৩১ লাখ ৯০ হাজার টাকা), সিঙ্গাপুরভিত্তিক সিটিজামান ইন্টারন্যাশনাল পিটিই লিমিটেড (১ হাজার ২৬১ কোটি ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকা) এবং এইটিন সলিউশন এসডিএন বিএইচডি (১ হাজার ২৬৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা) অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এছাড়া চিলিভিত্তিক ইমপোরতাসিওনেস ব্রাভো গ্রুপ-চিলি এসপিএ (১ হাজার ৯৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা), সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক রয়্যাল বাবজি ফুয়েল ট্রেডিং এলএলসি (১ হাজার ২৮১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা) এবং হংকংভিত্তিক সাইনোপ্রাউড ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন লিমিটেড (১ হাজার ১১২ কোটি টাকা) থেকে আমদানির প্রস্তাব ছিল।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক হেলথ আইকন ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিংস পিটিই লিমিটেড এবং কাজাখস্তানভিত্তিক কুমারাঙ্গাজি ওয়েল ফিল্ড (কেওএফ)—এই দুই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১ লাখ টন করে ডিজেল কিনতে যথাক্রমে ৯৩৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা এবং ৯৩৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি এইচ-২০ পেট্রো-কেম ইন্টারন্যাশনাল পিটিই লিমিটেড (১ হাজার ২৯০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা), এইচ-২০ কনস্ট্রাকশন পিটিই লিমিটেড (১ হাজার ৩৯৭ কোটি ৭২ লাখ ৫০ হাজার টাকা), দুবাইভিত্তিক ব্ল্যাক সোয়ান গ্লোবাল-এফজেডসিও (১ হাজার ২৪৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা) এবং চীনভিত্তিক ওকেরিয়েল করপোরেশনের (১ হাজার ৪০০ কোটি ২ লাখ টাকা) প্রস্তাবগুলোও সিসিই-র বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য পাঠানো হয়েছিল।