গাজীপুরের ভাওয়ালের শালবনসহ দেশের প্রায় সব শালবনেই এই সময়ে দেখা মেলে পরিযায়ী পাখি দেশি শুমচার। তবে বর্ষাকাল ছাড়া এই পাখির হদিস পাওয়া যায় না। ইংরেজিতে ‘ইন্ডিয়ান পিটা’ নামে পরিচিত এই পাখিটি প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে বাংলাদেশে আসে। সম্প্রতি বাংলাদেশ বন্য প্রাণী কেন্দ্রের রেস্টহাউসে অবস্থানকালে এই বিরল পাখির দেখা মেলে।
গত ৬ জুলাই সকাল ছয়টায় ক্যামেরা হাতে বনের ভেতর যাত্রা শুরু করেন লেখক। বন অধিদপ্তরের পাখিবিশারদ শিবলি সাদিক আগে থেকেই জানিয়েছিলেন যে, এলাকায় পাখিটি সহজেই পাওয়া যাবে। ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে প্রথমবার দেশি শুমচার ডাক শোনা যায়। এরপর প্রায় ২০ মিনিট পর একটি শালগাছে বসে পাখিটি তার সুরেলা কণ্ঠে গান গাইতে শুরু করে। ধারণা করা হয়, এই মিষ্টি ডাকের মাধ্যমে পাখিটি তার সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছিল।
কিছুক্ষণ পর দেখা যায়, পাখিটি মাটিতে বসে পোকা ধরে খাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে শালবনের মেঝেতে জমে থাকা পাতাগুলো এপ্রিলের বৃষ্টিতে পচে গিয়ে হরেক রকম পোকার জন্ম দেয়, যা দেশি শুমচার প্রধান খাদ্য। বিশেষ করে কেঁচো এই পাখির সবচেয়ে প্রিয় খাবার। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শুমচার মোট খাবারের ৮৬ ভাগই হলো কেঁচো।
মধ্য এপ্রিলে দেশি শুমচা ঝাঁকে ঝাঁকে বাংলাদেশের বনগুলোতে প্রবেশ করে। বর্ষাকাল তাদের প্রজনন মৌসুম। ডিম পেড়ে বাচ্চা ফোটানোর জন্য তারা মাত্র তিন সপ্তাহ সময় পায়, যার জন্য প্রচুর খাবারের প্রয়োজন হয়। এই খাদ্যের প্রাচুর্যের কারণেই তারা শালবন পছন্দ করে। তবে উত্তরের অনেক বাঁশঝাড়েও এই পাখির দেখা মেলে। সংসার গোছানো ও বাচ্চারা বড় হলে মধ্য আগস্টে তারা পুরো পরিবারসহ দেশ ছেড়ে চলে যায়।
পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় মোট ছয় জাতের শুমচা দেখা যায়, যার মধ্যে বাংলাদেশে পাঁচ জাতের উপস্থিতি রয়েছে। এর তিনটি জাত আবাসিক পাখি হলেও দেশি শুমচা ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মাত্র তিন মাসের জন্য এখানে আসে। বেঁচে থাকার জন্য তাদের পাতাঝরা বন এবং বৃষ্টির প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে শীত নামলে তারা পুনরায় বৃষ্টিপ্রবণ দেশগুলোতে পাড়ি জমায়।
তবে দেশি শুমচার প্রিয় আবাসস্থল টিকে থাকলেও বনের পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য মানুষের দ্বারা ঝরা পাতা কুড়ানোর প্রবণতা। পাতা সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার ফলে বনের উর্বরতা কমছে এবং পোকাখেকো পাখিরা খাবারের সংকটে পড়ছে। এর ফলে বনের গাছগুলোও অপুষ্টিতে ভুগছে বলে মনে করা হচ্ছে।