মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে’। আর্থিক, সামাজিক ও পারিবারিক বাধা পেরিয়ে যারা সফল হয়েছেন, তাদের জীবনগাথা উঠে আসে এই আয়োজনে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ জুন ২০২৬, বুধবার, বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালীর সুবর্ণচরের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের সন্তান স্বপ্না আক্তার। তিনি মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টের অদম্য তহবিল থেকে শিক্ষাবৃত্তিপ্রাপ্ত একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে তিনি আস্থা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের (সেনাকল্যাণ ট্রাস্ট/আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠান) ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস বিভাগে জুনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা এবং সাক্ষাৎকারটি অনুলিখন করেন সহকারী ব্যবস্থাপক মো. নাজিম উদ্দিন।

কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে স্বপ্না আক্তার বলেন, "ধন্যবাদ আপু আপনাকে আমাকে এত সুন্দর একটি চমৎকার অনুষ্ঠানে যুক্ত করার জন্য। আলহামদুলিল্লাহ, আমি খুব ভালো আছি। যদিও আমার চাকরির বয়স মাত্র ছয় মাস হলো, কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা এক কথায় দারুণ! আমাদের কর্মপরিবেশ অনেক ভালো ও আন্তরিক। আমাদের কোম্পানিতে সিইও স্যার থেকে শুরু করে ডিপার্টমেন্টের ম্যাম ও সহকর্মীরা সবাই অত্যন্ত ফ্রেন্ডলি ও হেল্পফুল।"

প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি ও পরিবেশের প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, "একদমই তাই আপু! সত্যি বলতে, চাকরিতে ঢুকে মানুষ নানা জটিলতায় কান্নাকাটি করে—এমন কথা শুনে আগে ভয় পেতাম যে করপোরেট লাইফ না জানি কেমন কঠিন হয়! কিন্তু আমার সেই ধারণা পুরো বদলে গেছে। আমাদের সিইও স্যার অত্যন্ত চমৎকার একজন মানুষ। উনি সব সময় কীভাবে কর্মীদের ভালো হয় এবং ক্লায়েন্টদের সর্বোত্তম সেবা দেওয়া যায়, সেদিকে নজর রাখেন। তা ছাড়া আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রতি মাসের শুরুতে একটি ‘সিইওস অ্যাড্রেস’ হয়, যেখানে আমরা সরাসরি সিইও স্যারের সঙ্গে কথা বলতে পারি, আমাদের সমস্যা ও মতপ্রকাশ করতে পারি। এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য স্যারকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই।"

শৈশব ও স্বপ্ন পূরণের তাড়না প্রসঙ্গে স্বপ্না জানান, "ছোটবেলায় আমি ভীষণ দুরন্ত ছিলাম। স্কুলে যেতাম, মাঠে-ঘাটে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করতাম, ঘুরে বেড়াতাম। সেখান থেকেই আস্তে আস্তে পড়াশোনার মাধ্যমে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটা ইচ্ছা তৈরি হয়। তবে গ্রাম থেকে এত দূর আসা মোটেও সহজ ছিল না, যদি না আমার বাবা-মায়ের নিঃশর্ত সমর্থন থাকত। আমার ভেতরে সব সময় একটা জেদ কাজ করত যে, আমাকে ইন্ডিপেনডেন্ট হতে হবে। নিজের স্বতন্ত্র আইডেনটিটি বা পরিচিতি তৈরি না করলে দেখা যাবে আজীবন অন্যের কথামতো চলতে হচ্ছে, আমার নিজস্ব কোনো মতামত থাকবে না। এই চিন্তা থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া।"

তবে এই পথচলা সহজ ছিল না। নোয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করে ঢাকায় আসার সিদ্ধান্তে গ্রামের মানুষের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হয় তাকে। স্বপ্না বলেন, "নোয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করার পর যখন অনার্সে ঢাকায় আসার সিদ্ধান্ত নিই, তখন গ্রামে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। ঢাকায় আমার কোনো আত্মীয়স্বজন ছিল না। গ্রামের মানুষ ও স্বজনেরা আব্বুকে নানানভাবে চাপ দিচ্ছিল— "একা মেয়েকে ঢাকায় পাঠাচ্ছ, ও তো খারাপ হয়ে যাবে, বাজে আড্ডায় জড়াবে। মেয়েকে চোখের আড়াল কোরো না, পরিচিত কেউ নেই, তাই ঢাকার সিদ্ধান্ত বাদ দাও। " ইভেন একপর্যায়ে সবাই আব্বুকে বুঝিয়ে আমার বিয়ে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় পাকা করে ফেলছিল।"

পারিবারিক সমর্থনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, "আমার জীবনে আমার বাবা-মায়ের অবদান আমি কোনো দিন শোধ করতে পারব না। আত্মীয়দের চাপে বাবা যখন কিছুটা দোটানায়, তখন আমার আম্মু শক্ত হয়ে দাঁড়ান। আম্মু সবাইকে বুঝিয়ে বললেন, "মেয়েটা যখন এত দূর থেকে পড়াশোনা করে আসতে চাইছে, ওকে একটা সুযোগ দেওয়া উচিত। " আম্মুর ওই দৃঢ় সমর্থনের কারণেই আব্বু রাজি হন এবং গ্রামের সবার কথা উপেক্ষা করে আমাকে একা ঢাকায় পাঠানোর সাহস করেন। এরপর আমি ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজে হিসাববিজ্ঞান (অনার্স) বিভাগে ভর্তি হই। অনার্স কমপ্লিট করে মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ করি এবং এরই মধ্যে চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারির শুরুতে আস্থা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে যোগ দিই।"

শহরের নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি জানান, "টালমাটাল কখনো হয়নি আপু, কারণ আমার মাথায় সব সময় একটা চিন্তা ঘুরত—আমার বাবা-মা গ্রামের মানুষের সব কটু কথা উপেক্ষা করে, বড় মুখ করে আমাকে ঢাকায় পাঠিয়েছেন। আমাকে তাদের সেই বিশ্বাস ও মুখের হাসি ধরে রাখতে হবে। আমি যদি কোনো বাজে আড্ডায় বা ভুল পথে পা বাড়াই, তবে গ্রামের মানুষের সেই আশঙ্কাই সত্যি হবে, যা তারা আমার বাবা-মাকে বলেছিল। বাবা-মায়ের সেই গভীর বিশ্বাসের কথা মনে করেই আমি সব সময় নিজেকে বিভ্রান্তি থেকে দূরে রেখেছি।"

জীবনের কঠিন মুহূর্তের কথা উল্লেখ করে স্বপ্না বলেন, "হ্যাঁ আপু, এমনটা একবার হয়েছিল। যখন আমার ইন্টারের (এইচএসসি) রেজাল্ট দেয়, তখন রেজাল্ট কিছুটা খারাপ এসেছিল। তখন ভীষণ মনোবল হারিয়ে ফেলেছিলাম। মনে হয়েছিল রেজাল্ট যেহেতু খারাপ হয়েছে, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাব না, আর হয়তো এগোতে পারব না। স্বাভাবিকভাবেই ভেবেছিলাম এখন গ্রামে ফিরে বিয়েশাদি করে ফেলি, নিজের সংসার সামলাই।"

সেই হতাশা কাটিয়ে ওঠার পেছনে বাবার অনুপ্রেরণার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, "তখন আমার আব্বু আমাকে ফোন দিয়ে একটি কথা বলেছিলেন, যা আমার জীবন বদলে দেয়। আব্বু বলেছিলেন, "একটা পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়ে তোমার যোগ্যতা বিচার হয় না, এই রেজাল্টই তোমার পরিচয় না। তুমি রেজাল্টের চিন্তা বাদ দিয়ে অ্যাডমিশন টেস্টের ভালো প্রস্তুতি নাও। একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলেই এই পেছনের জিনিস কেউ দেখবে না। " বাবার সেই ফোনে পাওয়া শক্তি থেকেই আমি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম। আজকের এই স্বপ্নার পেছনে দুটি মজবুত পিলার—আমার বাবা এবং মা।"

বর্তমানে স্বাবলম্বী হয়ে পরিবারের ও সমাজের ওপর প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, "অবশ্যই আপু! এখন আমার বাবা-মা গর্ব করে সবার সামনে বলতে পারেন যে তাদের মেয়ে ঢাকায় চাকরি করছে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে আমাদের নিজেদের ঘরে। আমার ভাই এখন তার মেয়েকে (আমার ভাতিজিকে) অনুপ্রাণিত করে বলে, "তুমি তোমার ফুফুর মতো হবা। ও যেমন গ্রামে থেকে গিয়ে ঢাকায় পড়াশোনা করে স্বাবলম্বী হয়েছে, তুমিও ওর মতো হবে। " আমার ভাতিজিও এখন বলে যে সে ফুফুর মতো হতে চায়।"

প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা ব্যক্ত করে স্বপ্না বলেন, "আমাদের এলাকাটা একদম প্রত্যন্ত চরাঞ্চল। এখনো ২০২৬ সালে এসেও সেখানে শিক্ষার সচেতনতা পুরোপুরি পৌঁছায়নি। মেয়েরা প্রাইমারি বা হাইস্কুল পার হলেই ধরে নেয় বিয়ে হয়ে যাবে, ওরাও তা মেনে নেয়। আমার ইচ্ছা আছে গ্রামের সেসব মেয়েদের এবং তাদের অভিভাবকদের সচেতন করা, যাদের পড়ার প্রচণ্ড ইচ্ছা আছে কিন্তু সুযোগ পাচ্ছে না। তাদের পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া এবং উৎসাহ দেওয়াই আমার মূল লক্ষ্য।"

ব্যক্তিগত জীবন ও জীবনসঙ্গীর সমর্থন প্রসঙ্গে তিনি জানান, "জি আপু, এক বছর হয়ে গেল আমাদের সংসারের। আমি সত্যিই খুব লাকি! আমি সব জায়গায় ভালো মানুষ পেয়েছি—ভালো বাবা-মা, ভালো কর্মক্ষেত্র এবং একজন দারুণ হাজব্যান্ড। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, আমার হাজব্যান্ডও মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টের একজন ‘অদম্য মেধাবী’!"

জীবনসঙ্গীর সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "ও আমাকে ভীষণ মেন্টাল সাপোর্ট দেয়। পড়াশোনা ও চাকরির ক্ষেত্রে সবদিক থেকে হেল্প করে। আজ যে আমি আপনার এই অনুষ্ঠানে আসব, ও আমাকে একদম সুন্দর করে রিলাক্স রেখে প্রিপেয়ার করে পাঠিয়েছে। আমার যেকোনো অর্জনে বা কাজে ও আমার চেয়েও বেশি এক্সাইটেড থাকে!"

প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করা অন্যান্য মেধাবীদের উদ্দেশ্যে স্বপ্না আক্তার বলেন, "আমি বলব, প্রতিকূলতা আসবেই, তবে সেটা সাময়িক। সব বাধা কাটিয়ে নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে, কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আমরা যখন সব অতিক্রম করে এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি, তোমরাও অবশ্যই পারবে! আর যেকোনো প্রয়োজনে ছোটদের মনোবল দিতে ও সহায়তা করতে আমি সব সময় প্রস্তুত।"

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, "আমার কর্মস্থলের সিইও স্যার, সহকর্মী, আমার বাবা-মা, আমার স্বামী এবং বিশেষ করে মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টকে অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আপনারা পাশে ছিলেন বলেই আমাদের পথচলা সহজ হয়েছে।"