‘আমার ছেলেটার বয়স মাত্র দুই বছর। সে বুঝে গেছে, আমি দেখতে পাই না। সে বুঝে গেছে, সে চুপ করে থাকলে আমি তাকে খুঁজে পাব না। তাই সে অনেক সময় চুপচাপ ঘরের এক কোনায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি তাকে খুঁজে পাই না। তখন খুব ভয় লাগে। খুব অসহায় লাগে।’ কথাগুলো বলছিলেন একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মা।

আমি তাঁর কণ্ঠে মায়ের অসহায়ত্ব শুনতে পাচ্ছিলাম। সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ প্রত্যেক মায়ের থাকে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বাস্তবতা—দেখতে না পাওয়া। তিনি বলছিলেন, ‘আমার ছেলে বুঝে গেছে, আমি তাকে চোখে দেখতে পারি না। তাই সে যখন লুকিয়ে থাকে বা চুপ করে থাকে, তখন তাকে খুঁজে পাওয়া আমার জন্য কঠিন হয়ে যায়।’

.

আমি সেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মাকে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করার পরামর্শ দিলাম। স্মার্টফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করে অ্যাপটি চারপাশের দৃশ্য বিশ্লেষণ করে কথার মাধ্যমে জানিয়ে দেয় কী আছে, কে আছে, কী ঘটছে।
কয়েক সপ্তাহ পর তিনি আমাকে ফোন করলেন। তাঁর কণ্ঠে এবার আর অসহায়ত্ব ছিল না; ছিল আনন্দ আর স্বস্তি। তিনি বলেন, ‘এখন ফোন আমাকে বলে দেয়—“শিশুটি দাঁড়িয়ে আছে”, “শিশুটি খেলছে”, “শিশুটি দরজার পাশে আছে”। আমি এখন অনেক দ্রুত তাকে খুঁজে পাই।’ ফোন রাখার পর অনেকক্ষণ আমি চুপ করে ছিলাম। কারণ, আমি উপলব্ধি করছিলাম, প্রযুক্তি কখনো কখনো শুধু একটি যন্ত্র নয়। এটি একজন মায়ের উদ্বেগ কমিয়ে দিতে পারে। এটি একজন মানুষের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে পারে।

আমি নিজেও একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ। ছোটবেলা থেকে আমার জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে। কেউ একটি ভিজিটিং কার্ড হাতে দিলে আমাকে বলতে হতো, ‘এখানে কী লেখা আছে, একটু পড়ে বলবেন?’
কেউ যদি কোনো বই হাতে ধরিয়ে দিতেন, জানতে হতো, ‘এটা কোন বই?’ ব্যাংকের কাগজপত্র, অফিসের নথি, দোকানের পণ্যের গায়ে লেখা তথ্য—সবকিছুর জন্য অন্য কারও সাহায্যের প্রয়োজন হতো। সহায়তা পাওয়া খারাপ কিছু নয়। কিন্তু প্রতিবার সাহায্য চাইতে হয়, তখন নিজের অজান্তেই স্বাধীনতার একটি অংশ হারিয়ে যায়।

.

আজ পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি সংবাদপত্র পড়ি। তবে কাগজের পত্রিকা হাতে নিয়ে নয়। আমার স্মার্টফোনের মাধ্যমে। এআইভিত্তিক প্রযুক্তি সংবাদপত্রের লেখা আমাকে পড়ে শোনায়। আমি দেশের খবর জানি, বিশ্বের খবর জানি, মতামত পড়ি, বিশ্লেষণ পড়ি।

যে কাজের জন্য একসময় অন্যের সময় ও সহায়তার প্রয়োজন হতো, এখন আমি নিজেই করতে পারি।

অফিসে যাওয়ার আগে আমি যে শার্টটি পরতে চাই, সেটি কী রঙের? সেই রঙের সঙ্গে কোন প্যান্ট মানাবে? একসময় এসব প্রশ্নের উত্তর অন্যের কাছে জানতে হতো। এখন আমার ফোনই বলে দেয়—‘এটি নীল রঙের শার্ট’, ‘এটির সঙ্গে কালো প্যান্ট মানাবে।’
অনেকের কাছে এটি হয়তো তুচ্ছ একটি বিষয়। কিন্তু নিজের পোশাক নিজে নির্বাচন করার স্বাধীনতা, নিজের মতো করে নিজেকে উপস্থাপন করার আনন্দ—এগুলো কোনো ছোট বিষয় নয়। আরও অবাক লাগে যখন ভাবি, আমি এই লেখাটিও মূলত কণ্ঠ ব্যবহার করে লিখছি। আমি কথা বলছি, আর এআই সেই কথাগুলোকে লেখায় রূপান্তর করছে।

.

একসময় একটি প্রতিবেদন বা নিবন্ধ লিখতে আমার অনেক বেশি সময় লাগত। আজ প্রযুক্তির কারণে আমি আরও দ্রুত, আরও দক্ষভাবে কাজ করতে পারছি।
হাজারো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ আজ একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। কেউ এআই ব্যবহার করে বই পড়ছেন, কেউ চাকরির আবেদন করছেন। কেউ অনলাইন ব্যাংকিং করছেন, কেউ নিজের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। কেউ–বা প্রথমবারের মতো স্বাধীনভাবে শহরের রাস্তায় চলাচল করার সাহস পাচ্ছেন।

আমরা প্রায়ই এআই নিয়ে আলোচনা করি কর্মসংস্থান, অর্থনীতি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দৃষ্টিকোণ থেকে। কিন্তু খুব কম মানুষ ভাবি, এআই একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য কী অর্থ বহন করে। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মায়ের জন্য কী অর্থ বহন করে। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী চাকরিজীবীর জন্য কী অর্থ বহন করে।

আমার কাছে এআই মানে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়। এটি তথ্যের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ। এটি মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ। এটি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সুযোগ।

.

অবশ্যই এআই সব সমস্যার সমাধান নয়। এখনো অনেক ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল সেবা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পুরোপুরি ব্যবহারযোগ্য নয়। এখনো ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটি নিশ্চিত করার জন্য অনেক কাজ বাকি। তবু আমি আশাবাদী। কারণ, প্রথমবারের মতো প্রযুক্তি শুধু আমাদের জন্য তৈরি হচ্ছে না; প্রযুক্তি আমাদের কথা শুনছে, আমাদের প্রয়োজন বুঝছে এবং আমাদের সঙ্গে পথ চলছে।

যে পৃথিবীতে একসময় আমাকে প্রায় প্রতিটি তথ্যের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হতো, সেই পৃথিবীতে আজ আমি অনেক কিছু নিজেই করতে পারি।
তাই যখন কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘এআই আপনার কাছে কী?’ আমি প্রযুক্তিগত কোনো সংজ্ঞা দিই না। আমি শুধু বলি—এআই আমার চোখ।

ভাস্কর ভট্টাচার্য: একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটি বিশেষজ্ঞ ও প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী।
E-mail: [email protected]