১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই বুধবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের কেপ কেনেডি থেকে নীল আর্মস্ট্রং, এডউইন বাজ অলড্রিন এবং মাইকেল কলিন্সকে নিয়ে মহাশূন্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে অ্যাপোলো ১১। কর্মদিবসের ব্যস্ততা সত্ত্বেও এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি প্রত্যক্ষ করতে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রায় ১০ লাখ দর্শক। ভিড়ের মাঝে ছিলেন তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট স্পিরো অ্যাগনিউ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন। কেবল সমাবেশস্থলই নয়, টেলিভিশনের পর্দায় এই দৃশ্য সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছিলেন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ। উৎসবমুখর পরিবেশ থাকলেও মূল রোমাঞ্চের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও কয়েক দিন।
উৎক্ষেপণের তিন দিন পর নভোচারীরা চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করেন। ২০ জুলাই নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন 'ইগল' নামক লুনার মডিউলে প্রবেশ করেন। অন্যদিকে, মাইকেল কলিন্স মূল কমান্ড মডিউল 'কলম্বিয়ায়' অবস্থান করে চাঁদের পৃষ্ঠের ছবি তোলা এবং যোগাযোগ রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করেন। কমান্ড মডিউল থেকে লুনার মডিউলটি আলাদা হয়ে যাওয়ার পর চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় ২০ জুলাই বিকাল ৪টা ১৭ মিনিটে চন্দ্রপৃষ্ঠে নামার প্রস্তুতি নেন নভোচারীরা। এরপর রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে নীল আর্মস্ট্রং মডিউলের মই বেয়ে নিচে নেমে চাঁদের বুকে পা রাখেন, যা বাংলাদেশ সময় ছিল ২১ জুলাই সকাল ৮টা ৫৬ মিনিট।
সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে নীল আর্মস্ট্রং উচ্চারণ করেন, ‘দ্যাটস ওয়ান স্মল স্টেপ ফর ম্যান, ওয়ান জায়ান্ট লিভ ফর ম্যানকাইন্ড’। এর ১৯ মিনিট পর বাজ অলড্রিন তাঁর সঙ্গে যোগ দেন এবং তাঁরা উভয়ে মিলে নমুনা সংগ্রহসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক কাজ সম্পন্ন করেন।
১৯৬৯ সালের ২১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের সময় বেলা ১টা ৫৪ মিনিটে চন্দ্রপৃষ্ঠ ত্যাগ করেন নভোচারীরা। আর্মস্ট্রং এবং অলড্রিন চাঁদের পৃষ্ঠে মোট ২১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট সময় অতিবাহিত করেন, যার মধ্যে আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় তাঁরা মডিউলের বাইরে ছিলেন। প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও ঘুমের পর লুনার মডিউলের অ্যারাইভাল ইঞ্জিন চালনা করে তাঁরা কলম্বিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
২৪ জুলাই দুপুর ১২টার সময় প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী জাহাজ ইউএসএস হরনেটের মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে মহাকাশযানটি অবতরণ করে এবং তাঁরা পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করেন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের স্বাগত জানান। তবে পৃথিবী ও চাঁদের জৈবিক সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে নভোচারীদের ২১ দিন একটি মোবাইল কোয়ারেন্টাইন ফেসিলিটিতে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়েছিল।
অ্যাপোলো ১১ মিশনের অভাবনীয় সাফল্যের পর ১৯৬৮ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে মোট ২৪ জন নভোচারী চাঁদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন, যাদের মধ্যে ১২ জন চাঁদের বুকে হেঁটেছেন। তাঁরা গবেষণার জন্য সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন মহামূল্যবান চাঁদের পাথর 'লুনার রক'। এরপর প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে মানববাহী চন্দ্র অভিযান স্থবির থাকলেও ২০২৬ সালের আর্টেমিস ২ মিশনের মাধ্যমে প্রথম নারীসহ আরও ৪ জন নভোচারী চাঁদের কক্ষপথে ভ্রমণ করেছেন। এখন বিশ্ববাসী প্রতীক্ষায় আছে কবে চাঁদের বুকে কোনো নারীর পদচিহ্ন পড়বে।