‘সবুজ প্রকৃতি আর জালের মতো বিস্তৃত খাল-দিঘি মিলিয়ে অপার্থিব এক আবহ’—যে রূপময়তায় একসময় বরিশালের পরিচয় ছিল, আজ তা ভরাট ও দখলের করালগ্রাসে ক্লান্ত এক কংক্রিটের নগরে পরিণত হওয়ার পথে। এই রূপান্তর কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়, বরং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক উদাসীনতা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের খেসারত। একের পর এক খাল বেদখল এবং জলাশয় ভরাটের ফলে এই ঐতিহ্যবাহী নদীমাতৃক শহরের অবস্থা এখন রাজধানী ঢাকার মতোই সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।
১৫৭ বছরের পুরোনো এই শহরে একসময় সগৌরবে টিকে ছিল ২৪টি খাল। তবে বর্তমানে মাত্র চারটি খালে কোনোমতে পানিপ্রবাহ অবশিষ্ট আছে। এর মধ্যে সাতটি খালের কোনো অস্তিত্বই নেই এবং ১৩টি প্রায় মৃত। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যাচ্ছে শহরের অলিগলি। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, খোদ সিটি করপোরেশনই ২০০২ সালে দুই লেনের সড়ক নির্মাণের লক্ষ্যে ঐতিহাসিক নবগ্রাম খালটি ভরাট করেছিল। বর্তমানে টিকে থাকা জেল খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রবাহগুলোর দুই পাড় দখল করে আরসিসি পিলার দিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন এবং ফেলা হচ্ছে বাজারের টন টন বর্জ্য। শুধু খাল নয়, ২০১১ সালের মহাপরিকল্পনায় থাকা ৪৩৬টি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পুকুরের অর্ধেকের বেশি আজ বিলীন। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রায় দেড় হাজার পুকুরের বেশির ভাগই ভরাট করা হয়েছে। এমনকি গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানও শতবর্ষী লালার দিঘি বালু দিয়ে ভরাট করে প্লট তৈরির অন্যায্য উৎসবে মেতেছে।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে ঢাকা যখন বিশ্বের অন্যতম বাসযোগ্যতাহীন শহরের তালিকায় তলানিতে অবস্থান করছে, তখন বরিশালকে সেই একই আত্মঘাতী ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। একটি শহরের ফুসফুস ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশন পথ হলো এর খাল ও জলাভূমি। এগুলোকে গলা টিপে হত্যা করার কারণে বরিশালের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাচ্ছে এবং শহরের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বরিশালে এখনো যেটুকু স্বস্তি অবশিষ্ট আছে, তা রক্ষায় এখনই চূড়ান্ত সময়। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তন করা সম্পূর্ণ বেআইনি হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসন কেন নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অবিলম্বে জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে যৌথভাবে মাঠে নামতে হবে। মৌজা ম্যাপ অনুযায়ী দখল হওয়া খালের সীমানা চিহ্নিত করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে এবং মৃতপ্রায় খালগুলো পুনঃখনন করে কীর্তনখোলা ও কালিজিরা নদীর সঙ্গে পুনঃসংযোগ স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অবহেলা ও উদাসীনতার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় এই শহরকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।