রাজধানীর কাজীপাড়ার একটি কফি শপে দুই তরুণের আড্ডায় উঠে এল বিশ্বকাপের কথা। ফাইনাল শুরু হতে তখনও কিছুটা সময় বাকি। একজন বললেন, ‘বিশ্বকাপ ফাইনাল তিন ঘণ্টা পর মাঠে গড়াবে।’ অন্যজন কফির কাপে চুমুক দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘হ্যাঁ, কিন্তু বিশ্বকাপটা কবে শুরু হবে?’

শুনতে হাস্যকর মনে হলেও কথাটির গভীরে লুকিয়ে ছিল এক রূঢ় বাস্তবতা। ২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল বর্ণিল দর্শক, গোল, ভিএআর এবং পরিসংখ্যানের সমাহার। কিন্তু চার সপ্তাহ পর মনে প্রশ্ন জাগে—সফটওয়্যার-ফুটবলের এই যুগে মানুষের নিজস্ব সত্তা কোথায়? বর্তমান প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমীরা খেলাটিকে কেবল স্কোরলাইন দিয়ে নয়, বরং মানুষের মাধ্যমে মনে রাখতে পছন্দ করেন। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার অবাধ্যতা, রোনালদিনিয়োর স্বর্গীয় হাসি, বাজ্জিওর বিষণ্নতা কিংবা জিদানের জাদুকরি স্পর্শ—এরা কেবল খেলেননি, বরং ফুটবলের ভাষাই বদলে দিয়েছিলেন। বিপরীতে এবারের বিশ্বকাপ ছিল রোবোটিক এবং অতিমাত্রায় প্রশিক্ষিত। ফুটবল যত বেশি করপোরেট হয়েছে, তার চিরন্তন আনন্দ যেন তত কমেছে। কোচদের সফটওয়্যার, হাই-প্রেস এবং ডেটা অ্যানালিটিকসের ভিড়ে হারিয়ে গেছে মাঝমাঠের সেই অকারণ ড্রিবলিং কিংবা অসম্ভবকে সম্ভব করার দুঃসাহস।

আধুনিক কৌশলের আড়ালে মাঠের ভেতরের এক কদর্য রূপও ফুটে উঠেছে। ট্যাকটিকসের নামে ম্যাচজুড়ে ফাউল, সময় চুরি এবং প্রতিপক্ষের ছন্দ ভাঙতে সস্তা উসকানি যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল চালিকা শক্তি। এই অতিবাস্তববাদী রূপটি সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে আর্জেন্টিনার খেলায়। ফাইনালে ওঠার পথে তারা কার্যকর হলেও সুন্দর ছিল না। তাদের খেলায় ৯০ মিনিটের চেয়ে নকআউট ছকটিই বড় হয়ে উঠেছিল। সেমিফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে ফাউল আর প্রতিপক্ষের গতি থামানোর মরিয়া চেষ্টা হয়তো তাদের পার করে দিয়েছিল, কিন্তু ফুটবল অতিবাস্তববাদকে ক্ষমা করে না। কৌশল আর ফাউলের জোরে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানো গেলেও বিশ্বজয়ী হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

ঠিক এই জায়গাতেই স্পেনের টিকিটাকার প্রত্যাবর্তন ঘটে। তবে এবারের টিকিটাকা জাভি-ইনিয়েস্তাদের সেই ধীরগতির ক্ল্যাসিক পাসের বৃত্ত ছিল না। স্পেন এবার খেলেছে এক আধুনিক ও ক্ষুরধার টিকিটাকা—যেখানে পাসের মসৃণতার সঙ্গে মিশে ছিল অবিশ্বাস্য গতি এবং উইঙ্গারদের বিদ্যুৎগতির আক্রমণ। তারা প্রতিপক্ষের কুৎসিত ছক ভেঙে খেলার ভেতর ফিরিয়ে এনেছে আনন্দ ও স্বাধীনতা। কোচদের সফটওয়্যারকে ছাপিয়ে স্প্যানিশ খেলোয়াড়েরা পায়ে পায়ে এঁকেছেন ফুটবলের নতুন ক্যানভাস। ফুটবলের সৌন্দর্যই হলো এটি কোনো কোডিংয়ের সম্পূর্ণ অনুগত নয়। স্পেনের এই জয় আসলে ফুটবলের দমবন্ধ পরিবেশ থেকে এক টুকরো স্বস্তি।

সকালে কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশনে ভিড়ের মধ্যে দেখা হলো নব্বইয়ের দশকে ঢাকার মাঠে দাপিয়ে বেড়ানো খ্যাপাটে উইঙ্গার দীপু ভাইয়ের সঙ্গে। বিশ্বকাপের কথা তুলতেই তিনি সটান বললেন, ‘বাদ দাও ভাই! ফুটবলার কই? সব ল্যাপটপ কোচের হাতের পুতুল। রিমোট টিপলে ডানে যায়, কখনো বামে।’

হেসে উত্তর দিলাম, ‘তা ঠিক। তবে স্পেন কিন্তু এবার অ্যালগরিদমটা একটু ওলটপালট করে দিল, দীপু ভাই।’

একচিলতে হাসি দিয়ে তিনি বললেন, ‘আরে, ফুটবল তো প্রেমিকার মতো। তুমি যতই শিডিউল আর বাজেট কষে ডেট করতে যাও, দিন শেষে একটু পাগলামি থাকতে হয়।’