দেশে আবারও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে ডেঙ্গু। শহর ছাড়িয়ে গ্রাম—সবখানেই বিস্তার ঘটেছে মশাবাহিত এই ভাইরাসটির। এতে ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের সুস্থতায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি মিলে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এর মধ্যে চিকিৎসার প্রায় ৬৫ শতাংশ খরচই রোগীদের পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে।
সোমবার (২০ জুলাই) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ) আয়োজিত এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে এসব তথ্য জানানো হয়।
‘ডেঙ্গু-জ্বর সচেতনতামূলক সাইন্টিফিক’ এ সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ। সভাপতিত্ব করেন এনডিএফ’র সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারজিয়া বেগম।
অনুষ্ঠানে কি-নোট স্পিকার হিসেবে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর-উল আলম (সোহেল)। প্যানেলিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিসিএস হেলথ ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ডাক্তার মোস্তাফিজুর রহমান, বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাক্তার মাহবুব ইসলাম মজুমদার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আব্দুল্লাহ সাঈদ খান।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কেবল মৌসুমি তৎপরতা নয়, বরং বছরব্যাপী সমন্বিত পরিকল্পনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
সেমিনারে জানানো হয়, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, যেখানে ৩ লক্ষাধিক মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হন এবং প্রায় ১ হাজার ৭০০ জন মৃত্যুবরণ করেন। গত বছরও প্রায় ১ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হন এবং ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়।
সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের উদাহরণ টেনে বিশেষজ্ঞরা জানান, সিঙ্গাপুর পাবলিক এডুকেশন, কঠোর জরিমানা এবং ‘ওলবাকিয়া’ নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত মশা ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে ৭০ শতাংশ এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তি আমদানির বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে গবেষণার তাগিদ দেওয়া হয়।
তারা বলেন, করোনার সময় তৈরি করা পিসিআর মেশিনগুলো এখন অলস পড়ে আছে। এগুলো ব্যবহার করে ডেঙ্গুর কোন স্ট্রেইন (ধরন) সক্রিয় তা নির্ণয় করা সম্ভব, যা সঠিক চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
একই সঙ্গে ভ্যাকসিনের বিষয়ে জানানো হয়, চার প্রকার স্ট্রেইনের কারণে যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের ব্যাপক প্রয়োগে জটিলতা রয়েছে।
কি-নোট স্পিকার ডা. মো. জাহাঙ্গীর-উল আলম বলেন, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন বা বিলম্বিত চিকিৎসা রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ এমপি বলেন, ডেঙ্গুর কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। চিকিৎসার প্রায় ৬৫ শতাংশ ব্যয় রোগীদের নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা সাধারণ মানুষের ওপর বড় ধরনের মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, দেশে ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসকদের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়; এর জন্য সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম এবং সর্বস্তরের জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রতিটি পরিবারকে নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে- জানতে চাইলে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘স্বাস্থ্যখাতে সরকার আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বরাদ্দ দিয়েছে। এটি ইতিবাচক দিক। একই সঙ্গে এটি কতটা সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে পারে সেটিও দেখতে হবে। সংসদে ডেঙ্গু নিয়ে একাধিকবার কথা হয়েছে। বিরোধী দলের জায়গা থেকে আমরা সরকারকে প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতে জোর দিচ্ছি। কিন্তু এখনো সংসদে স্বাস্থ্য বিষয়ক কমিটি গঠন হয়নি। সেটি হলে সেখানে আমাদেরও জায়গা থাকবে। তখন বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব দিয়ে বলা যাবে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আরেক সংসদ সদস্য মারজিয়া বেগম বলেন, ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।
এ সময় তিনি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে পাঁচটি প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। সেগুলো হলো: জুন-সেপ্টেম্বরের পরিবর্তে বছরব্যাপী পরিকল্পনা গ্রহণ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত বেড ও পরীক্ষার সুবিধা রাখা, এআই, জিআইএস ও ড্রোনের মাধ্যমে মশার বংশবৃদ্ধির স্থান ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং ওলবাকিয়া প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করে পূর্বাভাস দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
সেমিনারে শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুস্তাফিজুর রহমান জানান, শিশুদের ডেঙ্গুর লক্ষণ বড়দের থেকে আলাদা হতে পারে। বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে উচ্চ জ্বর না থেকে সামান্য জ্বর, সর্দি-কাশি বা পেটে ব্যথা হতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘কেবল প্লাটিলেট কমে যাওয়াকে একমাত্র বিপদ চিহ্ন ভাবা ভুল। রক্তে হেমাটোক্রিট বা পিসিভি বৃদ্ধি পাওয়া এবং অনবরত বমি বা পেটে ব্যথা হওয়া বড় ধরনের সতর্কবার্তা।’
সেমিনারের সভাপতি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ডেঙ্গু এখন একটি মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালের পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।’ পাশাপাশি চিকিৎসকদের সর্বদা জনগণের পাশে থেকে সেবা প্রদানের আহ্বান জানান তিনি।