যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার অতিক্রম করেছে।

গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) ২টা ৪১ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুডের আগাম দাম বৃদ্ধি পায়। সেপ্টেম্বর মাসের সরবরাহের চুক্তির দাম ২ দশমিক শূন্য ৯ ডলার বা ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ১৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। রয়টার্সের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গত ১১ জুনের পর তেলের দাম এই পর্যায়ে ওঠা সর্বোচ্চ। এর আগে গত সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা এপ্রিল মাসের পর এক সপ্তাহের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৭১ ডলার বা ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৪ দশমিক ২০ ডলারে পৌঁছেছে, যা ১২ জুনের পর সর্বোচ্চ। আগামী আগস্টের সরবরাহের চুক্তির দাম গত সপ্তাহে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা মার্চ মাসের প্রথমার্ধের পর সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক বৃদ্ধি।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম দফা যুদ্ধ শুরুর পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে উঠেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে দাম সেই উচ্চতা ছাড়িয়ে যাবে কি না, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। উল্লেখ্য, গত এপ্রিল মাসে দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে জ্বালানি রেশনিং এবং ডলার সংকট দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশেও তখন পাম্পে দীর্ঘ সারি এবং বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে গিয়েছিল, যা ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও ঘটেছিল।

সংঘাতের সূত্রপাত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাধ্যমে ইরান ও ইসরায়েলের সাথে হওয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেওয়ার পর থেকে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করলে ইরানও পাল্টা জবাব দেয়। গত সপ্তাহের শেষভাগে এই সংঘাত আরও তীব্র হয়; যুক্তরাষ্ট্র টানা নয় রাত ইরানে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কুয়েত ও বাহরাইন ইরানের হামলার মুখে পড়ার কথা জানিয়েছে।

বাজার বিশ্লেষণকারী সংস্থা আইএনজি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা কমার লক্ষণ নেই। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় প্রাণহানি ঘটছে এবং উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে না এলে পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণের এক ‘অনিরাপদ’ বিকল্প পথ দিয়ে যাওয়ার সময় তেলবাহী দুটি ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটেছে, ফলে সেগুলো অচল হয়ে পড়ে। আইআরজিসির অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ট্যাংকারগুলোকে ওই পথ ব্যবহার করতে উৎসাহিত করেছিল। তবে রয়টার্স এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

বর্তমানে উভয় পক্ষই জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপের কথা জানালেও ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের বেঁধে দেওয়া নিয়ম না মানলে জাহাজে হামলা করা হবে। বিশ্বের সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে হয়ে থাকে।

যুক্তরাজ্যের ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) আজ ভোরে জানিয়েছে, ওমানের কুমজার উপকূলের উত্তর-পশ্চিমে এক জাহাজে আগুন লেগেছে।

বার্কলেজের বিশ্লেষক অমরপ্রীত সিং এক নোটে বলেন, "দুই পক্ষের নতুন অবরোধের মধ্যে এই অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি কতটা টেকসই হবে, তা আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ থেকেই বোঝা যাবে।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন, "সরবরাহ-সংকটের যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, বাজার এখনো তাতে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না। বর্তমানে তেলের মজুত গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম, যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায়।"

লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার মাত্র চারটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা আগের দিন ছিল ৮টি। এছাড়া শুক্রবারের পর থেকে পরিশোধিত জ্বালানি বহনকারী অন্তত তিনটি ট্যাংকার ও একটি বৃহৎ জাহাজ তেল বোঝাইয়ের জন্য প্রণালিতে প্রবেশ করেছে।