জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আমরা সংসদের ভেতরে লড়াই করব, প্রয়োজনে রাজপথেও লড়াই করব। যদি গণভোটের রায় ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণ নির্বাচনী ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারাবে।’

রোববার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা আয়োজিত ‘রক্তাক্ষরে জুলাই’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী বিশেষ চিত্রপ্রদর্শনীর সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘সংসদে দাবি আদায় হলে আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি না হয়, তাহলে আন্দোলনের মাধ্যমে সেই দাবি আদায় করা হবে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা জনগণের সঙ্গে বেইমানি করব না। জনগণের রায়কে অপমান করব না।’

বিচার বিভাগ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির উল্লেখ করেন, সরকার গঠনের আগে এবং নির্বাচনের আগে সবাই স্বাধীন বিচার বিভাগের কথা বলেছিল। কিন্তু নির্বাচন হওয়ার পর এখন আর সরকারি দল স্বাধীন বিচার বিভাগ চায় না। তারা স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, শক্তিশালী গুম-সংক্রান্ত কমিশন এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিশন চায় না। বরং তারা আগের ফ্যাসিবাদী কাঠামোই ধরে রাখতে চায়, যার ফলে তারা গণভোটের গণরায়কেও মানতে চায় না বলে তিনি দাবি করেন।

জুলাইয়ে নিহতদের বিষয়ে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ে যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করুন। শুধু কিছু অর্থ দিয়ে তাঁদের পরিবারকে সহায়তা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাঁদের স্মৃতিকে জাতির সামনে তুলে ধরুন, তাঁদের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখুন। কারণ, বর্তমান সরকার জুলাইয়েরই ফসল। আমরা যারা বিরোধী দলে আছি, তারাও জুলাইয়ের ফসল।’

জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্যকারীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘জুলাইকে নিয়ে অনেকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। আমি বলব, তাঁরা ছোট মনের মানুষ। আত্মসম্মানবোধ থাকলে জুলাইকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার কোনো সুযোগ নেই।’

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় এখনো অনেক কিছু করা হচ্ছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনৈতিক অপচর্চার কবল থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়নি। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা চুপচাপ আছি বলে কেউ ভাববেন না যে আমরা ঘুমিয়ে গেছি।’ গণরুম ও গেস্টরুম প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আর গণরুম হবে না। এই সুযোগ আর দেওয়া হবে না। গণরুম ও গেস্টরুমের কবর ২০২৪ সালেই রচিত হয়েছে, এটি আর ফিরে আসবে না। কেউ যদি ফিরিয়ে আনতে চায়, তাহলে তাদেরই ফিরিয়ে দেওয়া হবে।’

একই অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতায় আসার পর জুলাই অভ্যুত্থানের সব অঙ্গীকার ভুলতে বসেছে। তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে আমরা লক্ষ করছি, তারা গণভোটকে অস্বীকার করছে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আদেশকে অস্বীকার করছে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির জারি করা সকল আদেশকেও অস্বীকার করছে। অথচ এই জুলাই বিপ্লবের বেনিফিশিয়ারি (সুবিধাভোগী) হিসেবেই তারা আজ ক্ষমতায় এসেছে।’

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীরা দাবি করছেন যে গণভোট, সংবিধান সংস্কার এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে বাস্তবতায় ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে।

বিএনপির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে চার মাসে বিএনপি কখনো বলেনি যে তারা এই প্রক্রিয়া মানে না, রাষ্ট্রপতির এমন আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার নেই, কিংবা গণভোট সংবিধানবিরোধী। কিন্তু আজ সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি হাতে পেয়ে কেন জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে ইউটার্ন (উল্টো অবস্থান) নেওয়া হলো? কেন নিজেদের অবস্থান সম্পূর্ণ পরিবর্তন করা হলো?

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা এবং ডাকসুর সহসভাপতি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম)।