সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর গুলশানের দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিলাসবহুল সামগ্রী জব্দ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ওই ফ্ল্যাট দুটির মালামাল ক্রোক করতে এই অভিযান চালানো হয়। অভিযানে পাঁচটি বিলাসবহুল গাড়ির চাবি, রোলেক্সসহ আটটি দামি ঘড়ির প্যাকেট, ওয়ারেন্টি কার্ড এবং উচ্চমূল্যের আসবাবপত্র পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
জব্দকৃত সামগ্রীর মধ্যে ৩০০-এর বেশি কোট, ৫৩২টির বেশি টাই, ১০০-এর বেশি কামিজ এবং ৩ সেট মুক্তার গয়না রয়েছে। এছাড়া ফ্ল্যাটগুলো থেকে চারটি ঝাড়বাতি, খাট ও সোফাও জব্দ করেছে দুদক।
গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর দেশে ও বিদেশে বিস্তৃত ব্যবসা ছিল। তাঁর পরিবারের মালিকানায় ছিল ইউসিবি ব্যাংক এবং যুক্তরাজ্যে তিনি আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর যুক্তরাজ্যে সাইফুজ্জামানসহ আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ নেতা-মন্ত্রীদের সম্পদের অনুসন্ধান চালানো হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর তিন শতাধিক প্রোপার্টির (বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট) সন্ধান পাওয়া গেছে, যার আনুমানিক মূল্য ১৭ কোটি পাউন্ড।
ঢাকার গুলশানের ৬৬ নম্বর সড়কের নর্থওয়েস্ট (বি) ব্লকের ১১ নম্বর প্লটে সাইফুজ্জামানের দুটি ফ্ল্যাট অবস্থিত। এর মধ্যে এ-৭ নম্বর ফ্ল্যাটের আয়তন ৩ হাজার ৭৪৭ বর্গফুট এবং বি-৭ নম্বর ফ্ল্যাটের আয়তন ৩ হাজার ৮৩২ বর্গফুট।
দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত বছর ১৮ নভেম্বর ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত সাইফুজ্জামান চৌধুরীর এই ফ্ল্যাট দুটি ক্রোক করার আদেশ দেন। আদালতের আদেশে দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালককে ফ্ল্যাট দুটির নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে ফ্ল্যাটগুলো তালাবন্ধ থাকায় প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে দুদকের আরও একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২৯ এপ্রিল আদালত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ এবং মালামালের তালিকা তৈরির অনুমতি প্রদান করেন।
সেই আদেশের প্রেক্ষিতে আজ রোববার ওই দুই ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় দুদক। বিকেলে দুদকের উপপরিচালক ও তল্লাশি দলের প্রধান মো. মশিউর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "সাইফুজ্জামান চৌধুরীর গুলশানের ফ্ল্যাটে রোলেক্সসহ আটটি বিলাসবহুল ঘড়ির খালি প্যাকেট পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চারটি রোলেক্স ঘড়ির প্যাকেট। এসব ঘড়ির ওয়ারেন্টি কার্ডও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সেখানে পাঁচটি বিলাসবহুল গাড়ির চাবি পাওয়া গেছে। সেগুলোর মধ্যে একটি বিএমডব্লিউ গাড়ির চাবিও রয়েছে। পাশাপাশি দামি সব আসবাব ও জামাকাপড় পেয়েছেন তাঁরা।"
একটি বিলাসবহুল রোলেক্স ঘড়ির ওয়ারেন্টি কার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ঘড়িটি ১৮ ক্যারেট হোয়াইট গোল্ডের ‘Rolex Cellini Date’ (মডেল-৫০৫১৯)। ঘড়িটি ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি লন্ডনের বিখ্যাত ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ‘Harrods’ থেকে কেনা হয়। কার্ডটিতে ঘড়ির মালিক হিসেবে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নাম, মডেল নম্বর ৫০৫১৯ এবং সিরিয়াল নম্বর ৭৩৪৫২৪৫৯ উল্লেখ রয়েছে।
বিলাসবহুল ঘড়ির বিভিন্ন ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এই মডেলের ব্যবহৃত ঘড়ির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ২০ লাখ টাকার বেশি।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে বিভিন্ন মালামাল ও নথিপত্রের তালিকা প্রস্তুত করেছেন দুদকের কর্মকর্তারা। মশিউর রহমান জানান, আজ বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তালিকা করে বিরতি দেওয়া হয়েছে এবং আগামীকাল সোমবার সকাল থেকে পুনরায় কাজ শুরু হবে। তালিকা সম্পন্ন হলে জব্দকৃত মালামাল আদালতের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।