পদ্মা সেতু ও রেলসংযোগ চালুর পর থেকে যশোর বিমানবন্দরে যাত্রীর সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের এই বিমানবন্দরটি ধীরে ধীরে তার গুরুত্ব হারাচ্ছে। যাত্রীসংকটের মুখে সর্বশেষ ১৬ জুলাই থেকে ঢাকা–যশোর রুটে সাময়িকভাবে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস–বাংলা এয়ারলাইনস। এর আগে গত বছরের আগস্টে এই পথেই উড্ডয়ন বন্ধ করে দিয়েছিল নভোএয়ার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
যশোর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার থেকে ইউএস-বাংলার ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন এই রুটে সপ্তাহে মাত্র দুই দিন রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট পরিচালিত হবে। এর আগে ইউএস-বাংলা সপ্তাহে সাত দিন সাতটি ফ্লাইট পরিচালনা করত।
সূত্র জানায়, স্বল্প দূরত্বের এই রুটে যাত্রী কমে যাওয়ায় বেসরকারি বিমান সংস্থার জন্য এটি লোকসানি পথে পরিণত হয়। লোকসান কমাতে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে উড্ডয়ন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে পাঠানো চিঠিতে তারা জানিয়েছে, যাত্রীসংকটে এই রুটে বাণিজ্যিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে ইউএস–বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "যাত্রী–সংকটে বাধ্য হয়ে আমরা গত সপ্তাহ থেকে এই পথে উড্ডয়ন সাময়িকভাবে বন্ধ করেছি। একসময় এই পথে আমরা দিনে ছয়টি উড্ডয়ন পরিচালনা করতাম। গত বছর যাত্রী=সংকটে সেই সংখ্যা কমিয়ে দিনে একটি ফ্লাইট বা উড্ডয়নে নামিয়ে আনা হয়েছে; কিন্তু তার পরও যাত্রী–সংকটে ভুগতে হচ্ছিল। কোনো পথে একটি ফ্লাইট বা উড্ডয়ন পরিচালনা করে পরিচালন খরচ তুলতে হলে উড়োজাহাজের ধারণক্ষমতার ন্যূনতম ৭০ শতাংশ যাত্রী থাকতে হয়; কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই পথে আমরা ৫০ শতাংশের বেশি যাত্রী পাচ্ছিলাম না। এ অবস্থায় একটি উড্ডয়ন পরিচালনার জন্য আমাদের লোকবলসহ আনুষঙ্গিক বিনিয়োগ ও জ্বালানি বাবদ যে অর্থ খরচ হয়, সেই খরচই উঠছিল না।"
২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন এবং ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর রেলসংযোগ চালু হয়। শুরুতে ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেলযোগাযোগ চালু হলেও ২০২৪ সালের শেষের দিকে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা–যশোর পথে সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এর ফলে যশোর বিমানবন্দরের যাত্রী সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট নভোএয়ার তাদের উড্ডয়ন বন্ধ করে এবং ইউএস-বাংলা ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে আনে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, পদ্মা সেতু চালুর বছর অর্থাৎ ২০২১–২২ অর্থবছরে যশোর বিমানবন্দর দিয়ে মোট ৪ লাখ ৫ হাজার ৯০০ জন যাত্রী যাতায়াত করেছেন। এর মধ্যে ২ লাখ ১ হাজার ৬৯১ জন ঢাকা থেকে যশোরে এবং ২ লাখ ৪ হাজার ২০৯ জন যশোর থেকে ঢাকায় গেছেন। তবে পরবর্তী অর্থবছরে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, ২০২২–২৩ অর্থবছরে যাত্রী সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ২১ হাজার ৭০ জনে। আর সদ্য বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে ৪৮ হাজার ৪০৮ জনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ চার অর্থবছরের ব্যবধানে যাত্রীর সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের বেশি কমেছে।
এর আগে পদ্মা সেতুর প্রভাবে বরিশাল বিমানবন্দরও একই সংকটের মুখে পড়েছিল, যেখানে বর্তমানে কেবল বাংলাদেশ বিমানের তিনটি ফ্লাইট চলে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, যশোর বিমানবন্দরও কি বরিশালের মতো একই পরিণতির দিকে যাচ্ছে?