সাতক্ষীরায় জন্ম, শৈশব কেটেছে যশোরে, এরপর ঢাকায় এসে শুরু হয় চলচ্চিত্র জীবন। তবে সুচন্দার কথায়, তাঁর জীবনের পরিকল্পনায় কখনোই চলচ্চিত্র ছিল না। ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ শীর্ষক নিয়মিত সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেন।
সুচন্দা বলেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি যে আমি চলচ্চিত্রে কাজ করব বা নায়িকা হব। রক্ষণশীল পরিবার থেকে ওই সময়ে চলচ্চিত্রে এসে নায়িকা হওয়া খুব বড় ব্যাপার ছিল।’
সরকারি চাকরিজীবী বাবা এ এস এম নিজামুদ্দিন আতাইয়ুব ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক মা বেগম জাহানারার সন্তান সুচন্দা যশোরের মোমেন গার্লস স্কুলে পড়ার সময় থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। একবার ‘শকুন্তলা’ চরিত্রে অভিনয়ের পর শহরের মানুষ তাঁকে নাম ধরে নয়, বরং ‘শকুন্তলা’ বলেই ডাকত।
পরিচালক কাজী খালেকের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে প্রথম সুযোগ পেলেও সুভাষ দত্তের ‘কাগজের নৌকা’ ছবির জন্য তিনি নির্বাচিত হন। প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘উনি আমাকে দেখে প্রথমেই বললেন, “তোমার এত বড় বড় নখ তো রাখা চলবে না”।’
এরপর জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ ছবির শুটিংয়ে কাজ করতে গিয়ে তাঁদের সম্পর্কের সূচনা হয়। সুচন্দার ভাষায়, ‘ওনাকে যতটা না আমার ভালো লেগেছে, তার থেকে ওনার কর্মটা দেখে আমি ওনার প্রেমে পড়ে গেছি।’ শুটিংয়ে যাওয়ার পথে গাড়িতে বসার একটি স্মৃতি শুনিয়ে তিনি বলেন, ‘উনি এমন জোরে একটা টার্ন করতেন যে আমি সিট থেকে ওনার গায়ের ওপর গিয়ে পড়তাম। এই স্পর্শটাই এত মধুর ছিল।’
‘বেহুলা’র শুটিংয়ের সময় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মিলনস্থলে ভেলায় দৃশ্য ধারণের কথা মনে করে তিনি জানান, সাঁতার না জানলেও তিনি শুটিং করেছিলেন। ঝড়ে ভেলা ছিঁড়ে ভেসে যাওয়ায় কয়েক ঘণ্টা নদীতে আটকে ছিলেন তিনি। সেই সময় পরিচালক জহির রায়হান শটের আগে শুধু বলেছিলেন, ‘আপনি কিন্তু সব সময় অ্যাকশনে থাকবেন।’
১৯৭১ সালে জহির রায়হান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলে দুই সন্তানকে নিয়ে সুচন্দাকেও সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যেতে হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর নজর এড়াতে তিনি নিজের চেহারা বদলে ফেলেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মেকআপ ওটাই ছিল।’
স্বাধীনতার পর জহির রায়হান নিখোঁজ হন। তাঁর শেষ স্মৃতিচারণ করে সুচন্দা বলেন, ‘দৌড় দিয়ে এসে বলল, “আমার তো গাড়ির পেট্রলের টাকা নেই। আমাকে টাকা দাও।” তারপর আর কোনো দিন এলেন না।’
অভিনয়ের পাশাপাশি পরবর্তীতে প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন সুচন্দা। বাবার ইচ্ছা পূরণের জন্য তিনি ‘তিন কন্যা’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। তিনি জানান, ‘আমার বাবা বলেছিলেন, “তোমরা তিন বোন একটা ছবিতে অভিনয় করো। আমি দেখে যেতে চাই”।’
পরবর্তীতে তিনি ‘বিদেশযাত্রা’ পরিচালনা করেন, যা ‘সবুজ কোট কালো চশমা’ নামে মুক্তি পায়। এছাড়া জহির রায়হানের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘হাজার বছর ধরে’ ছবির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পরিচালক ও সেরা চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি পান।
জীবনের নানা উত্থান-পতনের কথা স্মরণ করে সুচন্দা বলেন, ‘জীবনে অনেক ঘাত–প্রতিঘাত, কষ্ট–দুঃখ পেয়েছি। কিন্তু তার হিসাব–নিকাশ করি না। যা পেয়েছি, সেটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট।’
নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র কর্মীদের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, এই প্রজন্মই আমাদের আবার সেই সোনালি দিনের চলচ্চিত্রে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।’
দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারাই আমাকে কোহিনুর আক্তার থেকে সুচন্দা বানিয়েছেন। আপনারা আমাকে দোয়া করবেন। আমি যেন শেষনিদ্রায় যাওয়ার আগপর্যন্ত আপনাদের ভালোবাসা নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারি।’






