সচেতন একজন নাগরিক হিসেবে আমি অনেক দিন ধরেই দেশের বিভিন্ন আন্দোলন অনুসরণ করে আসছিলাম। যেমন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন। খুব বেশি যে সক্রিয় ছিলাম, তা নয়; কিন্তু অনুসরণ করছিলাম। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে আমি ছিলাম তুরস্কে। দেশে ফিরে আসি ১৩ তারিখে। এসেই তো জড়িয়ে গেলাম।

আবু সাঈদের মৃত্যু আমার ভেতরটা নাড়িয়ে দিয়েছিল। তাঁর মৃত্যু আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। সাধারণ মানুষকে পাখির মতো গুলি করে মেরে শেখ হাসিনার সরকার তখন আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা কত নিষ্ঠুর হতে পারে। তারপর মৃত্যু হলো রিয়া গোপের। এত মৃত্যু চারদিকে। সরকার একদিকে নির্বিচার হত্যা করছে, অন্যদিকে তার মন্ত্রীরা ভয়ংকরভাবে মিথ্যাচার করে চলেছেন। এ অবস্থায় আর চুপ করে থাকা যাচ্ছিল না।

আমি মিরপুরে থাকি। মিরপুর ১০ একটা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। খুবই কষ্ট পেলাম। মানুষ হিসেবে আমি খুবই সংবেদনশীল। একের পর এক এ ধরনের ঘটনা আমাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, গণগ্রেপ্তার, এত নির্বিচার হত্যাকাণ্ড আর শিশুদের মৃত্যু, এত মিথ্যাচার; একজন শিল্পী হিসেবে আমি কী করছি?

.

প্রথম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলাম, যে রাষ্ট্রের কোনো অ্যাকাউন্টেবিলিটি (জবাবদিহি) নেই, সেটা আসলে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চেহারা হতে পারে না। তারপর সবাই যখন প্রোফাইল লাল করল, আমিও করলাম। এতক্ষণ পর্যন্ত যা কিছু করেছি, বাসায় থেকে অনলাইনে করেছি।

এরপর অবশ্যই আকরাম ভাইয়ার (পরিচালক আকরাম খান) কথা বলতে হবে। আমাদের শিল্পীদের একটা গ্রুপ আছে। সেখানে তিনি লিখলেন, ‘আমাদের আসলে ছাত্রদের জন্য কিছু করা উচিত। তাদের পাশে থাকা উচিত। একজন শিল্পী হিসেবে আমার কাছে মনে হচ্ছে। আপনারা কে কে আমার সঙ্গে যোগ দিতে চান জানান।’

আমি গ্রুপে লিখলাম, আপনার সঙ্গে যেতে চাই। তখন আরও অনেক তরুণ ছেলেমেয়ে লিখতে শুরু করল। বড়রাও ছিলেন, তবে তরুণদের কথা বিশেষভাবে বলতে চাই। আমরা খুব দ্রুত একটা বৈঠক করলাম ২৯ জুলাই। গোপন বৈঠক, খুবই ভয়ে ভয়ে। বৈঠকে চলচ্চিত্র নির্মাতা পিপলু আর খান ভাই, আকরাম খান ভাই, ধ্রুব হাসান ভাই নেতৃত্ব দিলেন। এক দিনের বৈঠকেই ঠিক করে ফেললাম, ১ আগস্ট আমরা রাস্তায় গিয়ে ছাত্রদের পাশে দাঁড়াব।

.
আবু সাঈদের মৃত্যু আমার ভেতরটা নাড়িয়ে দিয়েছিল। তাঁর মৃত্যু আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। সাধারণ মানুষকে পাখির মতো গুলি করে মেরে শেখ হাসিনার সরকার তখন আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা কত নিষ্ঠুর হতে পারে
.

আমাদের এই বৈঠকের খবর সরকার পর্যন্ত পৌঁছে গেল সেই দিনই। নানা ধরনের ফোন আসতে শুরু করল আমাদের সাবধান করে দিয়ে—এ ধরনের কোনো আন্দোলনে যেন আমরা জড়িত না হই। প্রথমে সবাই আমাদের না যাওয়ার জন্য অনুরোধ করল। বলল, আপনারা এ ধরনের আন্দোলনে যাবেন না। পুরো বিষয়টা সরকারের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। আপনারা বুঝতে পারছেন না, কী অন্যায় চলছে, একটা জঙ্গি উত্থান হচ্ছে। এ ধরনের নানা কথা বলে আমাদের নিরস্ত করার চেষ্টা করা হলো। এরপর শুরু হলো হুমকি। বলা হলো, আপনাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হবে।

৩০ জুলাই আমরা আরেকটা বৈঠক করলাম। সিদ্ধান্ত হলো, ঘটনা যা-ই হোক, আমরা রাস্তায় দাঁড়াব। পরে নানা মহল থেকে হুমকি আসতে শুরু করল। বৈঠকে আমরা কী বলছি, কী করছি, কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি—আমাদের গ্রুপের ভেতর থেকেই কেউ কেউ সেসব রেকর্ড করে সরকার বা প্রশাসনের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছিল। সবকিছু মিলিয়ে রুদ্ধশ্বাস একটা পরিস্থিতি তৈরি হলো। তবে আমরা খুবই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও ঐক্যবদ্ধ ছিলাম। ৩১ জুলাই আরেকটা বৈঠক হলো। ছাত্ররা তত দিনে ৯ দফা দাবি ঘোষণা করেছে। সেখানে বলা হলো, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।

৩১ জুলাই অনেক রাত পর্যন্ত আমরা ব্যানার লিখলাম। সেটা একটা অন্য রকম অনুভূতি। আগে তো কোনো আন্দোলনে আমি অংশগ্রহণ করিনি। আমাদের টেনশন, পরদিন যাব কী করে? কারফিউ চলছে। ফেস্টুন আর ব্যানার কার গাড়িতে যাবে? মাইক কার গাড়িতে যাবে? প্রতিটি চেকপোস্টে চেক হচ্ছে। ধ্রুব ভাই বললেন, ‘আমি অর্ধেকটা নেব। বাকিগুলো কে নেবে?’ সাহস করে বলে ফেললাম, ‘আমি। আমার গাড়ি হয়তো চেক করা হবে না।’

.

১ আগস্ট সকালবেলা তৈরি হলাম। গৃহকর্মী আমাকে দেখে অবাক। কারণ, আমি কামিজ পরেছি, কিন্তু পায়ে কেডস। তাঁকে বললাম। কিন্তু মা-বাবা আর আমার মেয়েকে আমি কিচ্ছু বলিনি। কেউ জানত না, আমি কোথায় যাচ্ছি। আমরা সংসদ ভবনের সামনে দাঁড়াতে গেলাম, ঠিক তখনই পুলিশ এল। পুলিশের এক কর্মকর্তা আমাদের নানা কিছু বোঝালেন। বললেন, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে আজকে প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান আছে। প্রধানমন্ত্রী এই রাস্তা দিয়ে যাবেন। তাঁর নিরাপত্তার একটা ব্যাপার আছে। তাঁদের সঙ্গে আমাদের ঘণ্টাখানেক তর্কবিতর্ক হলো। পরে আমাদের আনন্দ সিনেমা হলের সামনে দাঁড়াতে বলা হলো। ততক্ষণে প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। সেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রচুর মানুষ জড়ো হয়েছেন। এত মানুষ আমরা আশাই করিনি। লাইট, ক্যামেরা, আর্ট, কস্টিউম, মেকআপের সঙ্গে জড়িত অনেকে এসেছেন। আর অবশ্যই আলাদা করে বলতে চাই তরুণদের কথা।

সংসদ ভবনের সামনে থেকে আমরা ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হল পর্যন্ত মিছিল করে গেলাম। সেখানে বক্তব্য দিলাম। স্লোগান উঠল, ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক/ গণতন্ত্র মুক্তি পাক।’ পরিস্থিতি যে এতটাই দ্রুত বদলে যাবে, আমরা ভাবিনি। যখন বাসায় ফিরলাম, সবাই হতবাক। বাবা বললেন, ‘এটা তুমি কী করছ? এখন তো তোমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা দেবে।’

২ আগস্ট অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ স্যারের সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য ফোন পেলাম। শেখ হাসিনার পদত্যাগ চেয়ে এক দফা দাবি। মনে কিছুটা সংশয়, তবু গেলাম। মিছিল করে গেলাম প্রেসক্লাব থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত। আগের দিন যখন জনগণের কাতারে দাঁড়িয়েছিলাম, সেটার যে আলাদা একটা অনুভূতি আছে, সেটা আমি অনুভব করে ফেলেছি। ২ তারিখে যখন শহীদ মিনার পর্যন্ত হেঁটে গেলাম, সেটা আমার মনে গভীর প্রভাব ফেলল।

.
মা-বাবা আর আমার মেয়েকে আমি কিচ্ছু বলিনি। কেউ জানত না, আমি কোথায় যাচ্ছি। আমরা সংসদ ভবনের সামনে দাঁড়াতে গেলাম, ঠিক তখনই পুলিশ এল। পুলিশের এক কর্মকর্তা আমাদের নানা কিছু বোঝালেন।
.

৩ আগস্ট ছাত্রদের ডাকে শহীদ মিনারে গিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এক ছাত্র আমাকে ডেকে সামনে নিয়ে গেল। ওরা মাহফুজ আলমের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিল, আমাকে কথা বলতে বলল।

সমাবেশ শেষে বাসায় ফিরছি, তখন একটা মেয়ে আমাকে চিনতে পেরে আমাকে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আপু, আপনি জানেন না আপনি কী করছেন? আপনার একটা কথা আমাদের কত সাহস দিয়েছে, আপনি জানেন না।’

.

৫ আগস্ট মার্চ টু গণভবন কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছে। আমি তিন দিন একটা লাঠিতে পতাকা লাগিয়ে বের হচ্ছিলাম। সেদিনও লাঠিটা নিয়ে বের হওয়ার আগে বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। বাবা হাতে ধরে অনুরোধ করে বললেন, ‘আজকে যেয়ো না।’ বললাম, ‘মানুষ আমাকে বলেছে, তারা আমার কথা শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে রাস্তায় নেমেছে। তাদের পাশে না গিয়ে আমি থাকি কী করে!’

এরপর তো ছাত্র-জনতার জয় হলো। রাস্তায় বহু মানুষ আমাকে দেখে ‘ধন্যবাদ’ বলছিল। আর বলছিল, ‘আপু, আমরা জিতে গেছি।’ পুরোটা সময় রিকশায় একা একা ঘুরছিলাম। কী যে ভালো লাগছিল!

তারপর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলো। সেই সরকারের বহু মানুষ আমার পরিচিত। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে আমি কাজ করেছি। এই সরকার নিয়ে খুবই আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু সব মিলিয়ে তাঁরা হতাশ করলেন।

যাহোক, শেষ পর্যন্ত একটা সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন তাঁরা দিতে পেরেছেন। এ কৃতিত্ব তাঁদের দিতে হবে। কিন্তু দেশে যেভাবে মব সন্ত্রাস চলছিল, যেভাবে নারীরা নিগৃহীত হতে থাকল, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার আমলে ডানপন্থী বিভিন্ন শক্তির উত্থান ঘটল। তারা যেসব ঘটনা ঘটাল, তা খুবই দুঃখজনক। আন্দোলনের ফল হিসেবে যে সরকার এল, তাদের সময়ের এসব কর্মকাণ্ডে খুবই লজ্জিত বোধ করলাম।

.
তখন একটা মেয়ে আমাকে চিনতে পেরে আমাকে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আপু, আপনি জানেন না আপনি কী করছেন? আপনার একটা কথা আমাদের কত সাহস দিয়েছে, আপনি জানেন না।’
.

আমরা ভেবেছিলাম, অন্তর্বর্তী সরকার দেশটাকে ঢেলে সাজাবে; অন্তত কিছু ভালো পরিবর্তন আসবে। দুর্নীতি কমবে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কমবে, নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। নারী কমিশন গঠিত হলো, কিন্তু কমিশনের সদস্যদের বিরুদ্ধে সমাবেশ হলো, তাঁদের কুৎসিত গালি দেওয়া হলো। সরকার নীরব হয়ে রইল। যখন বুলডোজার দিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যখন বঙ্গবন্ধুর মূর্তি ভেঙে দিচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধাদের ম্যুরাল ভেঙে দিচ্ছে, বাউলদের ওপরে আক্রমণ হচ্ছে, তখনো সরকার কীভাবে নীরব ছিল, সেটা অবাক করে দিল। এ ঘটনাগুলো আমার কাছে খুবই কষ্টের। আমরা অনেক স্বপ্ন দেখেছি। ভেবেছিলাম, বাংলাদেশে বৈষম্য ঘুচবে, অন্তত ঘোচার একটা প্রক্রিয়া শুরু হবে।

আমার কাছে আরেকটি খুবই কষ্ট ও লজ্জার ব্যাপার ঘটল, যখন মুক্তিযুদ্ধকে জুলাইয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো। এটা যাঁরা করেছেন বা করতে চেয়েছেন, তাঁরা আসলে আন্দোলনের সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাংলাদেশ নামে স্বাধীন একটি রাষ্ট্র দিয়েছে। আমাদের ইতিহাসে অনন্য এ ঘটনার কোনো তুলনা নেই। একইভাবে জুলাই আন্দোলনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না।

দুই বছর পর এখন ফিরে তাকালে মনে হয়, চব্বিশের জুলাইয়ে যা হয়েছে, সেটা হওয়ারই ছিল। অনেকে অনেক তত্ত্ব দেবেন হয়তো; কিন্তু আমি রাস্তায় ছিলাম। আমি দেখেছি, মানুষ কী তীব্র ক্ষোভ নিয়ে পথে নেমেছিলেন। শেখ হাসিনার সরকার এতটাই স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিল যে জুলাইয়ের মতো একটা আন্দোলন অবশ্যম্ভাবী ছিল। জুলাইয়ের বিকল্প ছিল না। তবে পরে, বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যা হয়েছে, সেটা অন্য রকম হয়ে ওঠার বিপুল সম্ভাবনা ছিল। সেই দুঃখবোধ আমার কখনো যাবে না। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এমন একটি ঘটনা, যা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল।

  • আজমেরী হক বাঁধন: অভিনয়শিল্পী