দুই বছর পর তাঁদের জীবন অনেকটাই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে। তবে অভ্যুত্থান–পরবর্তী পরিস্থিতি মূল্যায়নে তাঁরা একই হতাশার কথা জানালেন।
.ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু ভ্রুক্ষেপ নেই কারও। সবার সম্মিলিত কণ্ঠের স্নোগান বরং বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিক—‘আমার ভাই মরল কেন, প্রশাসন জবাব চাই।’
দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ২ আগস্ট, স্থান রাজধানীর উত্তরার রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ প্রাঙ্গণ। চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কলেজের এক শিক্ষার্থীকে আটকসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্বিচার গুলি–খুনের প্রতিবাদে স্বতঃস্ফূর্ত ওই বিক্ষোভ। এতে যোগ দেন বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা; ছিলেন শিক্ষক ও অভিভাবকেরাও।
ওই দিনের বিক্ষোভে ছিলেন রাজউক কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শায়লা আক্তার শশী। বৃষ্টির মধ্যে রিকশায় বসে তাঁর স্লোগান দেওয়ার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীকী ছবিতে পরিণত হয় সেটি।
.শায়লা এখন বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়াশোনায় ফিরে গেলেও আন্দোলনের সেই স্মৃতি এখনো তাঁর কাছে উজ্জ্বল। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই থেকে আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন তিনি।
চলতি মাসের ৯ তারিখ রাজধানীর আফতাবনগরে কথা হয় শায়লার সঙ্গে। ভাইরাল ছবিটির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মানববন্ধনে মানুষের অংশগ্রহণ দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। আমার সব ভয় কেটে যায়, বিশেষ করে শিক্ষক ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণ আমার মনের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করে। পুরো কলেজ প্রাঙ্গণ স্লোগানে মুখর এবং তার মধ্যে ঝুম বৃষ্টি। আমি এ রকম দৃশ্য আগে দেখিনি। তখন স্লোগানের মধ্যে এমনভাবে নিমজ্জিত হয়ে যাই, কেউ আমার ছবি তুলছে, তা টের পাইনি।’
.অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই দাঁড়িয়েছিলাম। এরপর কী হবে, ভাবার সময় ছিল না।নুসরাত জাহান, শিক্ষার্থী, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়
সেদিনের বিক্ষোভে শামিল হওয়ার কথা মনে পড়লে এখনো গর্ব হয় শায়লার, সঙ্গে আফসোসও হয়। তাঁর ভাষ্য, যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে মানুষ জীবন দিয়েছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো এখনো নিজেদের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত। জুলাইয়ের শহীদদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি, অনেক আহত ব্যক্তিকে নিজের খরচে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। শায়লার ভাষায়, ‘একজন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে আমি আজকের দেশ দেখে আশাহত এবং খুবই লজ্জিত। এ রকম দেশের জন্য আবু সাঈদ, মুগ্ধরা জীবন দেননি। যে সিস্টেম (ব্যবস্থা) বদলানোর জন্য এত আত্মত্যাগ, আজও সেই একই সিস্টেমের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছি। কোনো পরিবর্তনই আমি দেখি না! পরিবর্তন হলো শুধু দল। জুলাই শুধুই একটা নাম এখন। এর প্রকৃত মূল্যায়ন কেউ করেনি।’
শুধু শায়লা নন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় নানাভাবে ভাইরাল হওয়া আরও ছয়জনের সঙ্গে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তাঁদের কেউ পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, কেউ আহত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছিলেন, কেউবা শহীদ ভাইয়ের মরদেহ কাঁধে নিয়ে মিছিল করেছিলেন। দুই বছর পর তাঁদের সবার জীবন আবার অনেকটাই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে। তবে গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী পরিস্থিতি মূল্যায়নে তাঁরা প্রায় একই ধরনের হতাশার কথা জানালেন।
এই ব্যক্তিদের অধিকাংশের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া বড় অর্জন হলেও রাষ্ট্র সংস্কার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণহত্যার বিচার, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি দমনে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। তবে কেউ কেউ মনে করেন, সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া; সরকারকে পর্যাপ্ত সময় দিলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব।
.একজন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে আমি আজকের দেশ দেখে আশাহত এবং খুবই লজ্জিত। এ রকম দেশের জন্য আবু সাঈদ, মুগ্ধরা জীবন দেননি। যে সিস্টেম (ব্যবস্থা) বদলানোর জন্য এত আত্মত্যাগ, আজও সেই একই সিস্টেমের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছি। কোনো পরিবর্তনই আমি দেখি না!শায়লা আক্তার, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী
টিনের ‘ঢাল’ হাতে নাসিরের প্রতিরোধ
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগের দিন ৪ আগস্ট রাজধানীর কারওয়ান বাজারে টিনের তৈরি ঢাল নিয়ে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন স্যানিটারি মিস্ত্রি মো. নাসির খান। তাঁর সেই ছবিও আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। যদিও তিনি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন আরও আগে, জুলাইয়ের ২২ তারিখে।
মতিঝিল এলাকায় চলতি মাসের ৯ তারিখ নাসিরের সঙ্গে কথা হয়। তিনি মুক্তকণ্ঠকে জানান, সেদিন সোনারগাঁও হোটেলের পাশে একটি অস্থায়ী বেড়া থেকে একটি টিন খুলে নিয়ে দুই টুকরা করেন। এর একটি দিয়ে ‘ঢাল’ বানান তিনি। সেটি নিয়ে অন্য আন্দোলনকারীদের পেছনে ফেলে পুলিশের সামনে চলে যান। একপর্যায়ে তাঁর কপালে ও হাতে ছররা গুলি লাগে। তাঁর পাশের আরেকজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হন। তখন আর টিনটা ধরে রাখতে পারেননি তিনি।
নাসির বলেন, ‘কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেছিল। পরে যখন দেখলাম, সরকার পাখির মতো গুলি করে দেশের মানুষকে হত্যা করছে, তখন বিবেকের তাড়নায় আমিও রাস্তায় নেমে এসেছিলাম। সেদিন আন্দোলনে না নামলে আক্ষেপ থেকে যেত।’ তাঁর মতে, সংস্কারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার তা কাজে লাগাতে পারেনি। একই সঙ্গে আহত যোদ্ধাদের তালিকায় নিজের নাম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য বর্তমান সরকারকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে বলে মনে করেন নাসির।
.কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেছিল। পরে যখন দেখলাম, সরকার পাখির মতো গুলি করে দেশের মানুষকে হত্যা করছে, তখন বিবেকের তাড়নায় আমিও রাস্তায় নেমে এসেছিলাম। সেদিন আন্দোলনে না নামলে আক্ষেপ থেকে যেত।স্যানিটারি মিস্ত্রি মো. নাসির খান
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা রায়হান
আন্দোলনে উত্তাল ১৯ জুলাই তারিখে উত্তরা পূর্ব থানার সামনে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন রায়হান মোল্লা। আহত অবস্থায় তাঁর সড়ক বিভাজকের আড়ালে আশ্রয় নেওয়ার সময়ের একটি ছবি ওই সময় তুমুল আলোচিত হয়। তিনি রাজপথে নেমেছিলেন ১৬ জুলাই।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় কলেজ অব অ্যাভিয়েশন টেকনোলজিতে অধ্যয়নরত রায়হান এখন ব্যবসা করছেন। পাশাপাশি তিনি জুলাই গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে তথ্য–উপাত্ত সংরক্ষণের কাজ করছেন।
.রায়হান বলেন, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, দুর্নীতি ও বৈষম্য কমানো এবং সবার সমান অধিকার নিশ্চিত হলেই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনার বাস্তবায়িত হবে।.
১০ জুলাই কারওয়ান বাজার এলাকায় কথা হয় রায়হানের সঙ্গে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সেদিন সকালে বন্ধুবান্ধব একত্র হয়ে ঢাকা–ময়মনসিংহ রোডের যান চলাচল বন্ধ করে দিই। ছাত্র–জনতার প্রতিনিধি হয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে গেলে আমাকে মিথ্যা প্ররোচনা দিয়ে আন্দোলনরত সবাইকে নিয়ে চলে যেতে বলে। আমরা চলে যেতে না চাইলে প্রথমে জীবননাশের হুমকি দেয় এবং পরে সরাসরি গুলি ছোড়ে। প্রথম গুলিটা করে আমার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত থেকে মাইকটা পড়ে যায় এবং আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। পরে সড়ক বিভাজকের পাশে আশ্রয় নিই।’
শারীরিক ক্ষত অনেকটাই সেরে গেলেও সেদিনের গুলির শব্দ, মানুষের আর্তনাদ আর হারিয়ে যাওয়া মুখগুলো আজও রায়হানকে তাড়া করে। তাঁর মতে, জুলাইয়ের লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠন। কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সেই লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। রায়হান বলেন, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, দুর্নীতি ও বৈষম্য কমানো এবং সবার সমান অধিকার নিশ্চিত হলেই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনার বাস্তবায়িত হবে।
.মুখ চেপে ধরা সেই ছবির নাহিদুল
আন্দোলন তখন তুঙ্গে। ৩১ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া মো. নাহিদুল ইসলামকে হাইকোর্ট এলাকার মাজার গেটের সামনে আটক করে পুলিশ। আটকের সময় তাঁর মুখ চেপে ধরার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়। নাহিদুল বৈষম্যহীন দেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন ১০ জুলাই।
নাহিদুল ধানমন্ডির নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক পরীক্ষা দিয়েছেন। এখনো ফল প্রকাশ হয়নি। বর্তমানে সহকারী পরিচালক হিসেবে নাটক নির্মাণে সম্পৃক্ত আছেন।
৯ জুলাই নাহিদুলের সঙ্গে তাঁর কলেজ প্রাঙ্গণে কথা হয়। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচিতে পুলিশ মারমুখী আচরণ শুরু করে। এর প্রতিবাদ করতে গেলে এক পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে বলে, “তোকে মেরে ফেলব।” আমি তখন বলেছিলাম, “আর কত গুম-খুন করলে আপনাদের মনে শান্তি আসবে?” তখন আমার মুখ চেপে ধরা হয়। পরবর্তী সময়ে আইনজীবীদের সহযোগিতায় হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে আমাকে ছাড়ানো হয়।’
গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পর তাঁর মূল্যায়ন হলো মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও ‘জয় বাংলা’কে আওয়ামী লীগ নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছিল বলেই তাদের পতন শুরু হয়েছিল। একইভাবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেও একটি গোষ্ঠী কুক্ষিগত করায় অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে।
সরকারকে সতর্ক করে নাহিদুল বলেন, তরুণ প্রজন্মকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা না করলে পরবর্তী প্রজন্মও আগের প্রজন্মকেই অনুসরণ করবে।
.গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পর তাঁর মূল্যায়ন হলো মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও ‘জয় বাংলা’কে আওয়ামী লীগ নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছিল বলেই তাদের পতন শুরু হয়েছিল। একইভাবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেও একটি গোষ্ঠী কুক্ষিগত করায় অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে।.
পুলিশের গাড়ির সামনে ‘মানবঢাল’ নুসরাত
নাহিদুলের মতো মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচিতে গিয়েছিলেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান। ওই কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই নূর আলমকে আটক করতে গেলে পুলিশের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান নুসরাত। তাঁর সেই প্রতিবাদের ছবি আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত ‘মুহূর্ত’ হয়ে ওঠে। এর আগে ১৮ জুলাই থেকে রাজপথে ছিলেন তিনি।
ডেমরা এলাকায় ৯ জুলাই নুসরাত মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই দাঁড়িয়েছিলাম। এরপর কী হবে, ভাবার সময় ছিল না।’ সেদিনের ঘটনার স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচিতে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা করে। সেখান থেকে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার করা শুরু করে। নূর আলম ভাইয়াকে যখন গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমার জায়গা থেকে যতটুকু প্রতিবাদ করা দরকার, সেটি করেছি। জুলাইয়ের আগে আমি জানতামই না, আমার মধ্যে এত সাহস আছে! সেই সাহস আমাকে এখনো অনুপ্রাণিত করে।’
নুসরাতের মতে, শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া ছাড়া অভ্যুত্থানের অনেক প্রত্যাশাই এখনো পূরণ হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, নারীর নিরাপত্তা ও জুলাই সনদের বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। তিনি মনে করেন, এখন সবচেয়ে জরুরি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।
.তখন আমার জায়গা থেকে যতটুকু প্রতিবাদ করা দরকার, সেটি করেছি। জুলাইয়ের আগে আমি জানতামই না, আমার মধ্যে এত সাহস আছে! সেই সাহস আমাকে এখনো অনুপ্রাণিত করে।স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান
ভাইয়ের লাশ কাঁধে মিমের মিছিল
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দিন ৫ আগস্ট বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গ থেকে নিহত ইসমাইল হোসেন রাব্বির মরদেহ কাঁধে নিয়ে চানখাঁরপুলে মিছিল করেন দুই বোন মিতু আক্তার ও মিম আক্তার। সেই ছবি আন্দোলনের অন্যতম স্মরণীয় প্রতীক হয়ে আছে।
দুই বোনের মধ্যে মিতু ছিলেন গৃহিণী। আর মিম তখন কবি নজরুল সরকারি কলেজের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী। তিনি ৩ আগস্ট থেকে আন্দোলনে ছিলেন।
বর্তমানে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে কর্মরত মিমের সঙ্গে ৯ জুলাই রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় কথা হয়। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন খুব বেশি ভাবেন না উল্লেখ করে মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, তবে নির্বাচিত সরকারের কাছে তাঁর প্রত্যাশা, শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়াবে এবং মব ও চাঁদাবাজি দমনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
.ঢাবিতে ছাত্রলীগের হামলার শিকার লামিয়া
আন্দোলন দিন দিন আরও বিস্তৃত ও ব্যাপক আকার ধারণ করছিল। এ পরিস্থিতিতে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা। ওই সময় ভিসি চত্বর থেকে আরেক নারী শিক্ষার্থীর হাত ধরে দৌড় দেন লামিয়া রায়হান। এরপরও ছাত্রলীগের একজন লাঠি হাতে তাঁদের ওপর চড়াও হন। ওই সময়ের একটি ছবি ব্যাপক ভাইরাল হয়।
লামিয়া ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী। ৭ জুলাই থেকে আন্দোলনে সরব ছিলেন তিনি।
.একটা আক্ষেপ রয়েছে লামিয়ার। জানালেন, গত দুই বছরে জুলাই নিয়ে নানা কর্মসূচিতে তাঁর ভাইরাল ছবি ব্যবহার করা হলেও তাঁকে কখনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।.
আজিমপুর এলাকায় ৯ জুলাই কথা হয় লামিয়ার সঙ্গে। মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘সেদিন ছাত্রলীগের হামলার সময় একজন মেয়ে আমার মতোই কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে এদিকে-সেদিক তাকাচ্ছিল। তখন ওর হাত ধরে বলি, চলো, আমরা এদিক দিয়ে দৌড় দিই। আমরা যখন দৌড়াচ্ছিলাম, তখন ছাত্রলীগের কয়েকজন আমাদের মারতে তেড়ে আসে। এ রকমই একটি ছবি সে সময় ভাইরাল হয়, যা আমরা পরে জানতে পারি।’
লামিয়া বলেন, ছবিটি অনেককে আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করেছে জেনে ভালো লাগে। তবে বৈষম্য, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন ছিল, তার বড় অংশই এখনো অপূর্ণ। তাঁর অভিযোগ, একটি গোষ্ঠী জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করায় এ অভ্যুত্থান নিয়ে মানুষের আগ্রহ কমে গেছে।
একটা আক্ষেপ রয়েছে লামিয়ার। জানালেন, গত দুই বছরে জুলাই নিয়ে নানা কর্মসূচিতে তাঁর ভাইরাল ছবি ব্যবহার করা হলেও তাঁকে কখনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে এই সাতজন বিক্ষোভে অংশ নেন, প্রতিবাদ জানান। তবে তাঁদের চাওয়া ছিল অভিন্ন—বৈষম্যহীন বাংলাদেশের বিনির্মাণ। শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে তাঁরা ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে দেখেন। কিন্তু নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন নিয়ে মানুষ রাজপথে নেমেছিল, তার বাস্তবায়নে এখনো অনেক দূর যেতে হবে মনে করেন তাঁরা। তাঁদের প্রত্যাশা, শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন আইনের শাসন, জবাবদিহি ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।






