বাংলা সাহিত্যে আহমদ ছফার মতো লেখক আর নেই বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। এত বড় মাপের লেখক হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক কারণে বনানীর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁর শেষ ঠিকানা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শনিবার দুপুরে রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে ‘আহমদ ছফা স্মৃতিবক্তৃতা ২০২৬’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্যে সলিমুল্লাহ খান এসব কথা বলেন। আহমদ ছফার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ‘আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা’ এবং ‘এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা’ এই আয়োজনের কথা জানায়।

সলিমুল্লাহ খান জানান, ২০০১ সালে আহমদ ছফার মৃত্যুর সময় দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলেও কবরস্থানের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ আমলের ব্যক্তিরা, যারা তাঁকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করতে দেননি। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০০১ সালের ২৮ জুলাই আহমদ ছফা মারা যান। তাঁকে কবর দিতে গিয়ে আমরা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলাম। যে আহমদ ছফা ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন বলা যায়, সেই আহমদ ছফাকে কবর দিতে গিয়ে ঘুষ দিতে হয়েছে, তুরাগের তীরে (ঢাকার মিরপুর এলাকা) একটা কবরের জায়গা পেতে।’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাঁর কবর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেন, ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্রশাসক বললেন, আহমদ ছফার কবরটা তো বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দেওয়া উচিত। তখন আহমদ ছফার ভ্রাতুষ্পুত্র নূরুল আনোয়ার আবেদন করলেন। সেটা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, দুই বছর ধরে লড়াই চলছে।’

স্থানান্তরের জটিলতা নিয়ে অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘আমি এটা জানতাম না যে এর জন্য গণপূর্ত ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হয়, তারপর সিটি করপোরেশন কাজটা করবে। আবার ঢাকা জেলার ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকেও অনুমতি নিতে হয়। এই সব নিয়ে এখনো কাজটা সম্পন্ন হয়নি।’

অনুষ্ঠানে ‘আহমদ ছফার স্মৃতি না বিকৃতি?’ শীর্ষক মূল বক্তৃতা দেন তাঁর ভাতিজা ও রচনাবলির সম্পাদক নূরুল আনোয়ার। তিনি মহিউদ্দিন আহমদের লেখা স্মৃতিচারণমূলক বই ‘আমার কথা কইবে পাখি’-এর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘এই বইয়ে আহমদ ছফাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। তাঁর সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য রয়েছে। আহমদ ছফাকে নিয়ে বিকৃতভাবে কিছু গল্প বানিয়েছেন মহিউদ্দিন।’ এর জবাবে নূরুল আনোয়ার নিজেও উপন্যাসের ঢঙে একটি বই লিখেছেন বলে জানান।

অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানও ওই বইয়ের সমালোচনা করে বলেন, ‘মহিউদ্দিন আহমদ নূরুল আনোয়ারকে ফোন করে বলেন, “আমি তো জানতাম না আহমদ ছফার কবর কোথায়”। আহমদ ছফাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে কবর দিতে দেওয়া হয়নি, তা মহিউদ্দিন আহমদ জানতেন না। অথচ তিনি তাঁর ওপর একটা বই লিখে বসেছেন। তাতে লেখকের ইনঅথেটিনটিসিটির (কৃত্রিমতা) প্রমাণ পাওয়া যায়।...আহমদ ছফাকে মহাত্মা বলা উচিত কি না, সেটা বিচার করতে হলে মহিউদ্দিন আহমদের স্মৃতিকথা নয়, আহমদ ছফা রচনাবলি পড়তে হবে।’

আহমদ ছফার কাব্যপ্রতিভার প্রশংসা করে সলিমুল্লাহ খান বলেন, শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের যুগে জন্মানোটি ছিল ছফার দুর্ভাগ্য। তবে তাঁর চিন্তামূলক গদ্যগুলো জাতির দিকনির্দেশক।

ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি আমাকে প্রায়ই বলতেন, আমি একটা উপন্যাস লিখতে চাই। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মলে (মল চত্বর) তাঁর সঙ্গে হাঁটতাম, তাঁর বইয়ের নাম ইংরেজিতে বলতেন “দ্য ওয়ার দ্যাট ওয়াজ বিট্রেইড”, অর্থাৎ আমাদের জাতির যে যুদ্ধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। আমি তাঁকে বলতাম, আপনি প্যাসিভ ভয়েসে (কর্মবাচ্য) বলছেন কেন, কে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, “দ্য ওয়ার দ্যাট ওয়াজ বিট্রেইড, বাট হু বিট্রেইড?” তখন তাঁর চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যেত।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বিতর্কের কথা উল্লেখ করে সলিমুল্লাহ খান বলেন, অনেকে মনে করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের খণ্ডন। কিন্তু আহমদ ছফার বক্তব্য ছিল, যদি তা খণ্ডন হয়, তবে স্বাধীনতার পর ভারতের সঙ্গে মিশে যাওয়ার কথা ছিল, যা হয়নি। তাঁর মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রমাণ করে না যে জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব মিথ্যা হয়ে এক জাতি তত্ত্ব সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

পরিশেষে, উচ্চশ্রেণির মাধ্যমে বাংলা ভাষার বিলুপ্তির আশঙ্কা প্রকাশ করে সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘যদি স্কুল–কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা না থাকে, বাংলা একটা দ্বিতীয়–তৃতীয় শ্রেণির ভাষায় পরিণত হয়; তাতে আপনার চাকরি হবে, আপনি জাতিসংঘের সভাপতি হবেন, আপনি আরও বড় বড় পদ পাবেন; কিন্তু আপনার দেশের ভেতরে শূন্যতা তৈরি হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার বড়লোকদের বাড়িঘরের নাম ও নম্বর ব্যতিক্রমহীনভাবে ইংরেজিতে, শতকরা ১০ ভাগও বাংলা দেখা যায় না। এ ঘটনা আমাদের চোখের সামনে ঘটছে। আমরা বলছি, শনৈ শনৈ উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এটার নাম গ্লোবালাইজেশন। এগুলোর বিরুদ্ধে আহমদ ছফা বলতেন।’

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন দৈনিক যুগান্তরের সহকারী সম্পাদক মাহবুব কামাল, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মোহন রায়হান এবং ব্যবসায়ী নেতা আবদুল হক।