ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) ক্যাফেটেরিয়ায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ‘ফিমেল জোন’ চালু করার পর ক্যাম্পাসজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। একদল শিক্ষার্থী একে নেকাব পরিহিত বা পর্দানশিন ছাত্রীদের জন্য একটি প্রয়োজনীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, অনেক শিক্ষার্থীর প্রশ্ন—দীর্ঘদিনের স্যানিটেশন, ওয়াশরুম ও নিরাপত্তা সংকটের সমাধানের আগে আলাদা বসার ব্যবস্থাকে কেন অগ্রাধিকার দেওয়া হলো?

গত বৃহস্পতিবার টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় খাবারের নতুন মেনুর পাশাপাশি এই ‘ফিমেল জোন’ উদ্বোধন করা হয়। এর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত তৈরি হয়।

এই উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-র ক্যাফেটেরিয়া ও রিডিং রুম সম্পাদক উম্মে সালমা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ডাকসুর পর থেকেই অনেক ছাত্রী টিএসসিতে নামাজের জায়গা উন্নয়ন এবং ক্যাফেটেরিয়ায় তাঁদের জন্য একটি ছোট আলাদা বসার জায়গার দাবি জানিয়েছিলেন, যাতে তাঁরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে খাবার খেতে পারেন। আরেকটি বিষয় হলো, মেয়েদের পোশাক—হোক সেটা শাড়ি, গাউন বা অন্য কিছু অনেক সময় অপ্রস্তুত অবস্থায় সরে যেতে পারে বা বিভিন্ন কারণে ঠিক করার প্রয়োজন হতে পারে। তখন পোশাক ঠিক করার জন্য একটি আলাদা স্পেস দরকার হয়।”

কলাভবনের কমন রুম ও ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ায় নারীদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা থাকলেও টিএসসিতে তেমন সুযোগ ছিল না। এই প্রসঙ্গে উম্মে সালমা বলেন, “আমার দায়িত্বের আওতায় কমন রুম, রিডিং রুম ও ক্যাফেটেরিয়া থাকায় সেই প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

তবে এই উদ্যোগের সমালোচকরা বলছেন, তাঁদের আপত্তি বাড়তি সুবিধা নিয়ে নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ডাকসুর অগ্রাধিকার নির্ধারণের ধরন নিয়ে। তাঁদের অভিযোগ, টিএসসির নারী ওয়াশরুমের অপরিচ্ছন্নতা, স্যানিটারি প্যাড ভেন্ডিং মেশিনের অকার্যকারিতা, হ্যান্ডওয়াশের সংকট এবং পর্যাপ্ত বসার জায়গার অভাবের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষার্থী ফেসবুকে লিখেছেন, “টিএসসির মেয়েদের ওয়াশরুম যাঁরা ব্যবহার করেছেন তাঁরা বুঝবেন এখানে কোনটা আগে জরুরি! এরপরও শিবির- ছাত্রী সংস্থার মাথাব্যথা ক্যাফেটেরিয়ায় মেয়েদের আলাদা কর্নার নিয়ে! হায় সেলুকাস! মানুষজন স্যানিটেশন হাইজিনের অভাবে অসুস্থ হওয়ার পথে, সেখানে ডাকসুর মাথাব্যথা পর্দা নিয়ে। কতটা নির্বোধ আর ধর্মব্যবসায়ী হলে সব জায়গায় ধর্মীয় বিভাজন করে রাজনীতি করতে পারে!”

অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মনোনীত সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মানসুরা আলম ফেসবুকে লিখেছেন, “আমার কোনোভাবেই বুঝে আসলো না যে একটা কো-এড প্রতিষ্ঠানের ক্যাফেটেরিয়ায় কেন ফিমেইল জোন থাকবে। আজকে এইটা নিয়ে না বললে কালকে দেখবো ক্লাসরুমের মাঝখানে ফিমেইল জোন, স্বপন মামার দোকানেও ফিমেইল জোন তুলছে। জামাতি বুদ্ধি যতটুকু দেখাইলে মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তোলা যায়, এরা ততটুকুই করছে।”

এই সমালোচনাগুলোকে রাজনৈতিক ভুল ধারণা এবং হীনম্মন্যতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অভিহিত করেছেন উম্মে সালমা। তিনি বলেন, “এখন কেউ যদি রাজনৈতিক কারণে এটিকে বিভিন্নভাবে ট্যাগিং করে বা ভিক্টিমাইজ করার চেষ্টা করে, তাহলে আমি বলব, সেটি তাদের রাজনৈতিক ভুল ধারণা এবং হীনম্মন্যতার বহিঃপ্রকাশ।”

তিনি আরও স্পষ্ট করেন, “আমরা তো কম্বাইন্ড বসার জায়গা দখল করছি না। আবার কোনো মেয়েকেও ফিমেল জোনে যেতে বাধ্য করছি না। আমরা খুবই ছোট পরিসরে, মাত্র একটি টেবিল ঘিরে এই ফিমেল জোন করেছি। যাঁর প্রয়োজন হবে, তিনি সেখানে যাবেন। আর যিনি সবার সঙ্গে বসে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তিনি আগের মতোই কম্বাইন্ডভাবে বসবেন। তাই এখানে যে রাজনৈতিক আলোচনা বা বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে, সেটির আসলে কোনো প্রয়োজন ছিল না।”