বিশ্বকাপ মানেই ছিল বাবার পুরোনো বেতের চেয়ার আর তার হাতলে রাখা মডেল ৮৩৯-এর একটি প্রাচীন থ্রি-ব্যান্ড ওয়ান্ডার রেডিও। খেলা শুরুর আধঘণ্টা আগে ড্রয়িংরুমে টিভির সামনে চেয়ারটি টেনে বসতেন বাবা। এই রেডিওটি নিয়ে বাবার মুখে শোনা গল্প ছিল চিরচেনা। ১৯৮৬ সালে যখন গ্রামে টেলিভিশনের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা, তখন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার সেই মহাকাব্যিক ম্যাচের ধারাভাষ্য এই রেডিওতেই শুনেছিলেন তিনি। ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠের উত্তেজনা আর বারবার ‘গোল, গোল’ বলে চিৎকার করার স্মৃতি মনে করে বাবা বলতেন, “চোখে না দেখেও সেদিন গোলটা দেখেছি। কান দিয়েও খেলা দেখা যায়।”

সেই রাত থেকেই শুরু হয়েছিল বাবার আকাশি-সাদার প্রতি অনুরাগ। বিশ্বকাপের এক মাস আগে বাঁশের মাথায় আর্জেন্টিনার পতাকাটি ছাদের কার্নিশে টাঙানো ছিল এক অলিখিত নিয়ম। পতাকা ওড়ানোর সময় প্রতিবেশীর ব্রাজিল সমর্থক রহমান চাচার সঙ্গে বাবার মিষ্টি তর্ক আর হাসাহাসি ছিল বিশ্বকাপের আগাম সংকেতের মতো।

লেখকের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা জন্মেছে খবরের কাগজের পাতায়। বাবা অফিস থেকে ফেরার সময় নিয়মিত ‘মুক্তকণ্ঠ’ আনতেন। বিশ্বকাপের এক মাস ওই পত্রিকার খেলার পাতাটি হয়ে উঠত লেখকের একক সম্পত্তি। কাঁচি দিয়ে মেসির ছবি কেটে ডায়েরিতে আঠা দিয়ে লাগালে বাবা ঠাট্টা করে বলতেন, “কাগজ কেটে শেষ করলি, আমি খবর পড়ব কী?” তবে পরদিন অফিস থেকে ফিরে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করতেন, “আজকেরটা কাটবি না? মেসির দারুণ একটা ছবি আছে যে!”

বিশ্বকাপের রাতগুলোর বিশেষ আকর্ষণ ছিল মায়ের হাতের মুড়ি-চানাচুর। মাঝরাতে টানটান উত্তেজনার মুহূর্তে মা রান্নাঘর থেকে পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ আর সরষের তেল দিয়ে মাখানো মুড়ি নিয়ে আসতেন। সবাই মিলে মাদুর পেতে গোল হয়ে বসতাম। মাঝে মাঝে লোডশেডিংয়ের কারণে টিভি বন্ধ হয়ে গেলেও ত্রাতা হয়ে উঠত বাবার সেই পুরোনো রেডিও। ধারাভাষ্যের মাধ্যমে খেলা ‘দেখা’ চলত অবিরাম।

২০১৪ সালের ফাইনাল ছিল লেখকের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। মারাকানায় হিগুয়েইনের মিস এবং অতিরিক্ত সময়ে গোৎসের গোলে পরাজয়ের পর মেসির বিষণ্ণ চাহনি আজও চোখে ভাসে। তখন হাউমাউ করে কাঁদলে বাবা শান্ত গলায় বলেছিলেন, “কাঁদিস না। ফুটবল নব্বই মিনিটের, ভালোবাসা সারা জীবনের। ছিয়াশিতে ম্যারাডোনা পেরেছিল, তার উত্তরসূরিও পারবে। মেসির হাতে কাপ উঠবেই, দেখিস।”

আট বছর পর ২০২২-এর শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল। এমবাপ্পের হ্যাটট্রিক এবং ৩-৩ সমতায় ঘরে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। ২০১৪-এর সেই ভয় আবার ফিরে আসে। টেনশনে টিভির সামনে বসতে না পেরে বাবা বারান্দায় চলে যান। কারেন্ট না গেলেও রেডিওটি কানে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। অবশেষে মন্তিয়েলের শেষ শটটি জালে জড়াতেই পুরো মহল্লায় আনন্দের বিস্ফোরণ ঘটে। রেডিও হাতে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকে বাবাকে জড়িয়ে ধরে লেখক দেখেন তার চোখে জল। বাবা বলেন, “বলেছিলাম না! ম্যারাডোনার দেশ আবার পারল! মেসির হাতে কাপটা দেখে যেতে পারলাম রে!”

পরদিন ‘মুক্তকণ্ঠ’-এর প্রথম পাতায় ট্রফি চুম্বনের ছবিটি কেটে পুরোনো খাতার শেষ পাতায় লাগানো হয়। বাবা পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, “এবার খাতাটা পূর্ণ হলো।”

সেটিই ছিল বাবার সঙ্গে কাটানো শেষ বিশ্বকাপ। পরের বছর বাবা চলে যান। যাওয়ার আগে পরম যত্নে রেডিওটি হাতে দিয়ে ফিসফিস করে বলেছিলেন, “পরের বিশ্বকাপে এটা চালিয়ে রাখিস।”

২০২৬-এর বিশ্বকাপ চলছে। বেতের চেয়ারটি আজও টিভির সামনে একইভাবে পাতা থাকে, তবে মানুষটি নেই। লেখক নিজেই এখন চেয়ারটি টেনে রেডিওটি চালু করেন। বড় বোন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, “টিভি তো চলছেই, এই ভাঙা রেডিওটা অন করিস কেন রে?”

টিভিটির দিকে তাকিয়ে লেখক হালকা হেসে উত্তর দেন, “বাবা খেলা শুনছেন—কান দিয়ে খেলা দেখা যায়, জানিস না?”

ফাইনালের রাতেও সেই বেতের চেয়ারে এক কাপ চা, রেডিও আর খাতাটি রাখা থাকবে। বাবার জন্য।