‘আমার স্বামীর শেষ চিহ্নটুকু সংরক্ষণ করা হোক। আমার মেয়েটা বড় হয়ে যেন বাবার কবরটা অন্তত দেখতে পারে’—কান্নায় ভেঙে পড়ে এই আকুতি জানান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ মো. আসাদুল্লাহর স্ত্রী ফারজানা আক্তার।
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে জুলাই শহীদদের গণকবরে আয়োজিত দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। বাবার কবরে ফুল দিতে মায়ের সঙ্গে সেখানে উপস্থিত ছিল ছয় বছর বয়সী আরিফা জাহান লিলিও।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাবৃন্দ’ ব্যানারে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়া শহীদদের স্বজন এবং জুলাইয়ে আহত ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।
পেশায় গাড়িচালক মো. আসাদুল্লাহ (৩১) ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। পরবর্তীতে ২৪ জুলাই আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে তাঁকে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
আক্ষেপের সাথে ফারজানা আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামীর শেষ ইচ্ছা ছিল, ঘরের পাশে তাঁকে কবর দেওয়া হবে। কিন্তু তাঁর শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়নি। বেওয়ারিশ হিসেবে তাঁকে এখানে দাফন করা হয়েছে। ছয় মাস আগে কবর শনাক্ত হলেও, বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমার স্বামীর শেষ চিহ্নটুকু সংরক্ষণ করা হোক। আমার মেয়েটা বড় হয়ে যেন বাবার কবরটা অন্তত দেখতে পারে।’
তিনি অভিযোগ করেন, বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়া শহীদদের কবরগুলো চরম অবহেলার শিকার। কবর শনাক্ত করার পর সেগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, ফলে টানা বৃষ্টিতে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কবরের চিহ্ন মুছে যাবে বলে আশঙ্কা করে তিনি সরকারের কাছে শহীদদের কবর স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের দাবি জানান।
একই অনুষ্ঠানে পোশাক ব্যবসায়ী সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম তাঁর সন্তানের হত্যার বিচার দাবি করেন। যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা রাশেদা বেগম বলেন, ‘১৮ জুলাই আমার ছেলেটা চা খাওয়ার কথা বলে ঘর থেকে বের হয়েছিল। তারপর আর ফিরে আসেনি। শেষ দেখাটাও দেখতে পারিনি। এখন কবরও মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। দুই বছর হয়ে গেল, এখনো খুনিদের বিচার হলো না। আমি বেঁচে থাকতে বিচার দেখে যেতে চাই। দুনিয়ায় আর কিছু চাই না।’
অন্যদিকে, শনির আখড়ার বাসিন্দা শহীদ রফিকুল ইসলাম (২৯) ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তাঁর বোন জাহেদা করিম বলেন, ‘ছোটবেলায় আমাদের মা–বাবা দুজনই মারা যান। আমিই ওকে আদর-যত্ন করে বড় করেছি। আমাদের বুকের ধন ছিল সে। আমার ভাইটাকে আর কোনো দিন আদর করতে পারব না।’
দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নিয়ে ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের এই অবস্থানে পৌঁছানো শহীদদের আত্মত্যাগ ছাড়া সম্ভব হতো না। অথচ শহীদদের কবর নষ্ট হচ্ছে এবং নামফলক সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। শহীদদের প্রাপ্য সম্মান না দিলে ভবিষ্যতে কোনো সংকটে মানুষ রাজপথে নামবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন শহীদ সোহেল রানার ভাই আলভী নাবিল হোসেন, ভয়েস ফর রিফর্মের উদ্যোক্তা ও সংগঠক ফাহিম মাসরুর, বৈষম্যবিরোধী শহীদ-আহত সেলের সদস্য তামিম আহমেদ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত নাছির খান ও রাহাত আহমেদ। বক্তারা শহীদদের কবর সংরক্ষণ, যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচারের দাবি জানান।