বছর ঘুরে জুলাই মাস ফিরে আসে হাজারো শহীদের রক্তের দায়ভার নিয়ে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় লাখো মানুষ যে স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন, তার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে—সেই প্রশ্নের নির্মোহ উত্তর খোঁজা এখন আমাদের কঠিন দায়িত্ব। জুলাইকে স্মরণ করার অর্থ হলো সেই প্রতিশ্রুতির কাছে ফিরে যাওয়া এবং নিজেদের প্রশ্ন করা যে, বৈষম্য, অন্যায় ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে মানুষ জীবন দিয়েছিল যে বাংলাদেশ গড়ার জন্য, সেই পথে আমরা কতটুকু এগিয়েছি।

শহীদ রিয়া, শহীদ নাঈমা ও শহীদ নাফিসার পরিবারের মতো হাজারো শোকাতুর পরিবারের জীবনে আর কোনোদিন স্বাভাবিক জুলাই ফিরে আসবে না। একইভাবে, যারা প্রতিদিন জুলাইয়ের রাজপথে লড়াই করেছেন, তাদের জীবনেও আর সেই স্বাভাবিকতা নেই। বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্নে রাজপথ রঞ্জিত করা অসংখ্য তরুণের মনে জুলাই যে গভীর ছাপ রেখে গেছে, তা আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। জুলাই আমাদের প্রজন্মের কাছে কেবল সাহসের আখ্যান নয়, বরং অসমাপ্ত দায়িত্ব পূরণের এক দলিল।

আন্দোলনের একজন সংগঠক হিসেবে তাপসী মনে করেন, কোনো গণ-অভ্যুত্থান একদিনে তৈরি হয় না। ছোট ছোট সিদ্ধান্ত, অগণিত নামহীন মানুষের সাহস এবং অসংখ্য অচেনা মুখের সংহতির মধ্য দিয়েই একটি গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম হয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, "সেই ইতিহাস যদি আমরা লিখে না রাখি, তাহলে একদিন ক্ষমতার ইতিহাসই একমাত্র ইতিহাস হয়ে দাঁড়াবে।"

চেক লেখক মিলান কুন্দেরার একটি উক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক, যেখানে বলা হয়েছে, “ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম মূলত বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম।” প্রতিটি গণ-অভ্যুত্থানের পর ইতিহাস নিয়ে নতুন লড়াই শুরু হয়। কে নেতৃত্ব দিয়েছেন বা কার অবদান বেশি ছিল—এমন বিতর্কের ভিড়ে প্রায়ই হারিয়ে যায় সাধারণ মানুষের গল্প। ইতিহাসে সাধারণত তারাই নায়ক হয়ে ওঠেন, যারা নিজেদের প্রধান কুশীলব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস হলো সাধারণ মানুষের সংহতির।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিচারণ করে তাপসী জানান, প্রথমে ছাত্রলীগ এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনী তাদের ওপর হামলা চালায়। প্রশাসন হল খালি করে দেওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থী হল ছাড়তে বাধ্য হলেও কয়েকজন ছাত্রী প্রতিবাদস্বরূপ হলে অবস্থান করেন। সেই কঠিন সময়ের কথা বর্ণনা করে তিনি বলেন, "বিদ্যুৎবিহীন, খাবার-পানিবিহীন নির্ঘুম, অন্ধকার সেই রাতগুলোয় আমাকে সাহস জুগিয়েছিল জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্রীরা, পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন আমার হলের খালারা, যাঁদের কেউই অভ্যুত্থানের পর কোনো কিছু দাবি করেননি। তাঁরা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন নিজেদের নৈতিকতা থেকে।"

তিনি আরও মনে করেন ৩ আগস্ট রাতের কথা, যখন ছাত্রলীগ-যুবলীগের আক্রমণে নিরাপদ আশ্রয়ের পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না, তখন এক অসমসাহসী নারী রিকশাচালক তাদের আশ্রয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ৪ আগস্ট দুপুরে পুলিশের গুলি, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেটের মুখে যখন পেছনে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা ছিল, তখন কাঁটাবন মোড়ে এক অকুতোভয় মা তাঁর মেয়েকে নিয়ে খাবার ও পানি দিতে এগিয়ে আসেন এবং প্রয়োজনে আশ্রয় দেওয়ার জন্য নিজের বাসা চিনিয়ে দেন। তাপসী লিখেন, "ছাত্রলীগ–যুবলীগের আক্রমণে আমরা কোনোভাবেই নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তখন এক অসমসাহসী নারী রিকশাচালক আমাদের আশ্রয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ৪ আগস্ট দুপুরে যখন সামনে পুলিশের গুলি, কাঁদানে গ্যাসের শেল, রাবার বুলেট আর পেছনে আওয়ামী লীগের গুন্ডা সন্ত্রাসীরা; তখন কাঁটাবন মোড়ে এক অকুতোভয় মা তাঁর মেয়েকে নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন আমাদের খাবার আর পানি দিতে। প্রয়োজন পড়লে যেন আসতে পারি, তাই নিজের বাসাটাও চিনিয়ে দিয়েছিলেন।"

তাপসীর মতে, ইতিহাস জুলাইয়ের সেই মায়েদের, মিছিলের নারীদের কিংবা শ্রমিক, দিনমজুর, হকার ও রিকশাচালকদের প্রতিরোধের কথা মনে রাখেনি। তিনি বলেন, "যে ইতিহাস একটি গণ–অভ্যুত্থানকে গণমানুষের প্রতিরোধ থেকে ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াইয়ে নিয়ে যায়, যে ইতিহাস শুধু সুযোগসন্ধানী আর ক্ষমতাসীনদের জুলাইয়ের একমাত্র হিস্যাদার মনে করে, যে ইতিহাস শহীদদের রক্তের বিচারের চেয়ে বেশি নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে, সে ইতিহাসকে আমি প্রত্যাখ্যান করি।"

জুলাইয়ের মূল শক্তি ছিল মানুষ—রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম বা লিঙ্গের ঊর্ধ্বে। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিল্পী, শিক্ষক এবং সাধারণ পথচারীরাও এই লড়াইয়ের অংশ ছিলেন। যারা কখনো সংবাদপত্রের শিরোনাম হননি, তাঁরাই জুলাইকে কাঁধে বহন করেছেন। তবে সময়ের সাথে সাথে এই ইতিহাসকে সংকুচিত করে কয়েকটি ব্যক্তির বীরত্বগাথায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে তিনি মনে করেন। নারীদের অবদান, প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর লড়াইকে মূল বয়ান থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে, যা জুলাইয়ের প্রকৃত চেতনাকে অস্বীকার করার শামিল।

তাপসীর মতে, রাষ্ট্র যদি পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যায়, তবে তা হবে শহীদদের রক্তের সাথে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা। সত্যকে দলীয় সুবিধার কাছে বিক্রি না করা, বিচারকে রাজনৈতিক সমঝোতার মুখে বিসর্জন না দেওয়া এবং গণতন্ত্রকে কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রাখাই এখন প্রধান দায়িত্ব। কারণ মানুষ জীবন দিয়েছিল একটি আদর্শ রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য, নতুন কোনো ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরির জন্য নয়।

জুলাইয়ের দুই বছর পার হলেও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে। বিত্তশালীদের অপরাধের দায়মুক্তি, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন, শিল্পী ও ভিন্নমতের মানুষের ওপর আক্রমণ এবং বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা এখনো বিদ্যমান। ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পর এখন একটি নির্বাচিত সরকারের আমলে দেশ চলছে। এই সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান নীতিনির্ধারকেরা যেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে দ্রুত শিক্ষা নেন। কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতিই মানুষকে অভ্যুত্থানের পথে নিয়েছিল। মানুষের জুলাইকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই হোক এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

(লেখক: নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সংগঠক)