সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৪৫ বছর পর এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেন। তৎকালীন মেজর মোজাফফরের বর্তমান বয়স ৭৭ বছর।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ১৬ জুলাইয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে বনানীর একটি বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। জিজ্ঞাসাবাদ করে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিষয়টি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে জানানো হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের একটি দলের কাছে তাঁকে হস্তান্তর করা হয়।

ডিএমপি মোজাফফরকে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ‘পলাতক আসামি’ ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে কোন অভিযোগে বা কোন সামরিক বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়নি।

মোজাফফরের গ্রেপ্তার কেবল একজন দীর্ঘদিনের পলাতক সেনা কর্মকর্তাকে আটকের ঘটনা নয়। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা, বয়ান বা বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে যাওয়া সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন। "জিয়াকে হত্যার মুহূর্তে তাঁর কাছেই ছিলেন মোজাফফর।"

ফলে ৪৫ বছর পর তাঁর গ্রেপ্তারে পুরোনো কয়েকটি প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে—"সেদিন সার্কিট হাউসে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, হত্যার পর মোজাফফর কী ভূমিকা নিয়েছিলেন এবং এত বছর তিনি কোথায় ও কার সহায়তায় আত্মগোপনে ছিলেন।"

সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে জিয়া হত্যাকাণ্ডের একটি বর্ণনা দিয়েছেন। বইটির ত্রয়োদশ অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন, হামলাকারীরা সার্কিট হাউসের কক্ষগুলোতে জিয়াউর রহমানকে খুঁজছিলেন। গোলাগুলির শব্দ শুনে জিয়া কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে তাঁর সবচেয়ে কাছে ছিলেন মেজর মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন।

মাসকারেনহাসের বর্ণনায়, "মোজাফফর তখন দৃশ্যত কাঁপছিলেন। মোসলেহউদ্দিন জিয়াকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বইটিতে বলা হয়েছে, মোজাফফর ও মোসলেহউদ্দিন তখনো মনে করছিলেন, জিয়াকে হত্যা নয়, সার্কিট হাউস থেকে তুলে নেওয়া হবে।"

এরপর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান সামনে এসে সাবমেশিনগান দিয়ে জিয়াকে গুলি করেন। বইটিতে উল্লেখ রয়েছে, সার্কিট হাউস থেকে সেনানিবাসে ফেরার পথে মোজাফফর মোসলেহউদ্দিনকে বলেছিলেন যে তিনি জানতেন না যে রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হবে; তাঁর ধারণা ছিল, জিয়াকে শুধু সার্কিট হাউস থেকে বের করে আনা হবে। তবে এটি মাসকারেনহাসের বইয়ে মোজাফফরের নামে দেওয়া বক্তব্য, যা কোনো আদালতে শপথ নিয়ে দেওয়া বা জেরার মাধ্যমে যাচাই করা সাক্ষ্য নয়।

মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, "মোজাফফরের ভূমিকা হত্যার মুহূর্তে উপস্থিত থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা সশস্ত্র সেনাসদস্যদের নিয়ে আবার সার্কিট হাউসে যান। বইটিতে বলা হয়েছে, তাঁরা জিয়ার শোবার ঘরে তল্লাশি চালান। ‘গোপন কাগজপত্র’ ও জিয়ার ব্যক্তিগত ডায়েরি খোঁজা হয়।"

এরপর জিয়ার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র একটি পুরোনো স্যুটকেসে ভরা হয় এবং জিয়া ও নিহত দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তার মরদেহ কাপড়ে মুড়িয়ে সামরিক যানে করে নিয়ে যাওয়া হয়। মাসকারেনহাস আরও লিখেছেন, পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন, যেখানে মঞ্জুর ‘বিপ্লবী পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দেন।

এই বর্ণনা সঠিক হলে ‘হত্যার পরিকল্পনা জানতেন না’—মোজাফফরের কথিত দাবি হত্যার পর তাঁর ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তর দেয় না। কারণ, হত্যার পরও তিনি বিদ্রোহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন এবং পরবর্তী সামরিক তৎপরতায় অংশ নিয়েছিলেন।

বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ১ জুন ভোরে মঞ্জুর ও সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছেড়ে পালান। মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, সামনের জিপে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব, মেজর মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মুনীর। "পথে সরকার-অনুগত সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে মতিউর রহমান ও মাহবুব নিহত এবং মুনীর গ্রেপ্তার হন। গোলাগুলির মধ্যে মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। বইটি প্রকাশের সময়ও তিনি পুরস্কার ঘোষিত পলাতক ছিলেন।"

জিয়া হত্যার পর ‘বিদ্রোহের’ অভিযোগে সামরিক আদালতে ১৮ সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়, যাদের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যদের কারাদণ্ড হয়। তবে মেজর এস এম খালেদ ও মেজর মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং তাঁদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে গ্রেপ্তার হয়ে কোর্ট মার্শাল হওয়া ১৮ কর্মকর্তার তালিকায় মোজাফফর ছিলেন না। তাঁর বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে কোনো রায় দেওয়া হয়েছিল কি না বা পুরোনো কোনো পরোয়ানা কার্যকর আছে কি না, সে বিষয়ে সরকার বা সেনাবাহিনী কিছু জানায়নি।

মোজাফফরের পলাতক জীবনের কিছু তথ্য পাওয়া যায় মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইয়ে। "মোজাফফরের পলাতক জীবনের একটি অংশের তথ্য পাওয়া যায় মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইয়ে।"

মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ ২০১৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারে একটি নিবন্ধে জানিয়েছেন, মইনুল হোসেন চৌধুরী ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত থাকাকালে ব্যাংককে পলাতক অভিযুক্ত মেজর এস এম খালেদের সঙ্গে মোজাফফরের দেখা করার কথা লিখেছেন। মইনুলের ভাষ্য অনুযায়ী, মোজাফফর ভারত থেকে ব্যাংককে গিয়ে খালেদকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং জিয়া হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত আলোচনা করেন।

মইনুলের বইয়ে লেখা আছে, চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে সার্কিট হাউস থেকে তুলে সেনানিবাসে আনার পরিকল্পনা করেছিলেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব ও মেজর খালেদ। তাঁদের দাবি ছিল, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের হয়রানির কারণে জুনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। মইনুল লিখেছেন, জিয়া কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পর মতিউর রহমান খুব কাছ থেকে তাঁকে গুলি করেন এবং অন্য কর্মকর্তারা আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন।

মইনুলের বইয়েও মোজাফফরকে গুলিবর্ষণকারী বলা হয়নি, তবে খালেদ ও মোজাফফরের বক্তব্য আলাদাভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে কোন তথ্যটি কার, তা স্পষ্ট নয়। এছাড়া তাঁদের দেওয়া বর্ণনা কোনো আদালতে জেরা বা যাচাই করা হয়নি।

"মইনুলের বর্ণনা সঠিক হলে ওই ব্যাংকক বৈঠকে অংশ নেওয়া দুই পলাতক প্রত্যক্ষদর্শীর মধ্যে মোজাফফরই পরে একমাত্র জীবিত ব্যক্তি হিসেবে ছিলেন। তাঁর বর্তমান বক্তব্য ওই পুরোনো বর্ণনার সঙ্গে মেলে কি না, সেটা রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করার সুযোগ তৈরি হয়েছে এখন।"

মইনুল হোসেন চৌধুরী লিখেছেন, ১৯৯১ সালে ঢাকায় এসে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে এই আলোচনার বিষয় জানান। মইনুলের ভাষ্য অনুযায়ী, মেজর খালেদ ১৯৯৩ সালে ব্যাংককে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

ডিএমপির আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে বলা হয়েছে, "হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তিনি বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন। সূত্রের তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে বনানীর একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।"

তবে গ্রেপ্তারের পর একটি সূত্র জানিয়েছে, জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর মোজাফফর ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন এবং ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে যাতায়াত করতেন। কিন্তু তিনি কত বছর ভারতে ছিলেন, কীভাবে ব্যাংককে যাতায়াত করেছিলেন বা কবে দেশে ফিরেছেন—সে বিষয়ে কোনো সংস্থা স্পষ্ট উত্তর দেয়নি। বনানীর বাসায় তিনি কতদিন ছিলেন বা কার সহায়তায় ছিলেন, তাও অজানা।

অনেকের মতে, মোজাফফরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে জিয়া হত্যাকাণ্ডের বেশ কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে, "হত্যার পর সার্কিট হাউসে ফিরে যাওয়ার কারণ, জিয়ার কক্ষে কী খোঁজা হয়েছিল, তাঁর ব্যক্তিগত কাগজপত্র ও মরদেহ কোথায় নেওয়া হয়েছিল এবং বিদ্রোহী কর্মকর্তাদের পরবর্তী পরিকল্পনা কী ছিল—এসব প্রশ্নেও তাঁর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।"

একই সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পলাতক জীবনের তথ্য এবং কারা তাঁকে সহায়তা করেছে, তা জানা গেলে ৪৫ বছর ধরে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে না পারার কারণ পরিষ্কার হতে পারে। তবে গ্রেপ্তারের পর মোজাফফরের নিজস্ব কোনো বক্তব্য এখনো প্রকাশিত হয়নি এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের নথিও জনসমক্ষে আসেনি।