ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি এবং খুনের মতো বেপরোয়া অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। গত সোমবার চাঁদা না পেয়ে চট্টগ্রাম মহানগরের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে সন্ত্রাসীরা ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এর আগে জুন মাসে ঢাকার মোহাম্মদপুরে চাঁদার দাবিতে একটি প্রতিষ্ঠানে হামলা, কর্মীদের মারধর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। এমনকি নরসিংদীতে এক ব্যবসায়ীর কান কামড়ে আহত করে তাঁকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ ধরনের হামলা ও ব্যবসায়ীদের ওপর আক্রমণ সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। এতে পুরো ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়, যা ব্যবসা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্থবির অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া অনাস্থা কাটিয়ে উঠতে সরকার নানা পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সরকারকে মনে রাখতে হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হলে এবং নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা না কাটলে বিদেশি বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি দেশি উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগে আগ্রহ হারাবেন।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পুলিশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন ও জন-আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দেখা যায়নি, ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাগরিকের প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাস পরও কেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে থাকবে?
সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই যে তিনটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছিল, তার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি অন্যতম ছিল। তবে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন পরিস্থিতি কতটা নাজুক তা প্রমাণ করে। এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫৬ জন নিহত হয়েছেন, যার ৮১ শতাংশই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা অন্যান্য দলের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে ঘটেছে। টিআইবির প্রতিবেদন বলছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫টি খুন, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি।
চট্টগ্রামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বিদেশে পলাতক এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারীরা এই হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত। গত দুই বছরে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও ব্যবসায়ীদের অপহরণের মতো অপরাধে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বারবার উঠেছে। এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতার বিরুদ্ধে এসব সন্ত্রাসীকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অপরাধী গোষ্ঠী রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া পেলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতা-কর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধে দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছিল। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তাঁদের অনেকের মধ্যে ‘এবার আমাদের পালা’—এ রকম মনোভাব দেখা যাচ্ছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কোথাও কোথাও এসব কর্মকাণ্ডে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা জড়িত বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, দলীয় লোকজনকে নিবৃত্ত করতে গত পাঁচ মাসে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাস পর আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থার এমন উদ্বেগজনক চিত্র কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা আইনশৃঙ্খলা উন্নতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর ও বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির কোনো বিকল্প সরকারের সামনে নেই বলে আমরা মনে করি।