কেমন আছেন? মুঠোফোনে মো. রকিব উদ্দিন বলেন, ‘ভালো আছি। তবে শরীরটা পুরোপুরি ভালো না।’ শরীর কি খুবই খারাপ? তিনি বলেন, ‘মাংসপেশিতে মোচড় দেয়। বাঁ পা ছোট হয়ে গেছে। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না। পঙ্গু হাসপাতালে কয়েক দিন আগে মেডিক্যাল বোর্ড বসেছিল। ডাক্তারেরা বলেছেন, আমি পুরোপুরি ভালো হব না। বিদেশে গিয়েও খুব লাভ হবে না।’
সর্বশেষ সরকারি হিসাবে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের গুলি ও সহিংসতায় শহীদ হন ৮৪৩ জন, আহত হন ১৪ হাজার ৩৭০ জন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন উত্তরার বাসিন্দা মো. রকিব উদ্দিন। তিনি এখন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী।
.আহত ব্যক্তিদের অনেকেই ফলোআপের জন্য নিয়মিত আসেন। তাঁরা অগ্রাধিকার পান। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া হয়।মো. রকিব উদ্দিন, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী
জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোয় ছাত্র–জনতার সঙ্গে রাজপথে ছিলেন মো. রকিব উদ্দিন। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকেলে উত্তরার আজমপুরে রবীন্দ্র সরণিতে আন্দোলনরত ছাত্র–জনতার ওপর পুলিশ গুলি চালায়। অনেকের সঙ্গে আহত হন উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী মো. রকিব উদ্দিন। গুলি লেগেছিল সামনের দিক থেকে—কোমরে। তখন তাঁর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলছিল।
.মো. রকিব উদ্দিন বলেন, ‘প্রথমে আমাকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তারপর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। সেখান থেকে রাত দুইটার দিকে আমাকে পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়।’ এরপর দীর্ঘদিন তিনি ওই হাসপাতালে ছিলেন। এ পর্যন্ত তাঁর পায়ে ও কোমরে তিনটি বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে। কোমরের অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপনের বিষয়টিও চিকিৎসকদের চিন্তার মধ্যে আছে।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) পরিচালক অধ্যাপক আবুল কেনান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আহত ব্যক্তিদের অনেকেই ফলোআপের জন্য নিয়মিত আসেন। তাঁরা অগ্রাধিকার পান। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া হয়।’
.জুলাই গণ–অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এ পর্যন্ত গুরুতর আহত ১৫৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, রাশিয়া ও তুরস্কে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১০৫ জন দেশে ফেরত এসেছেন। এখনো ৩৯ জন বিদেশে আছেন।.
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অধীন জুলাই গণ–অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আঘাতের তীব্রতা ও শারীরিক ক্ষতির গুরুত্বের বিবেচনায় গণ–অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। তবে আহত প্রত্যেক ব্যক্তিকে একটি করে ‘হেলথ কার্ড’ দেওয়া হয়েছে। এই কার্ড ব্যবহারে করে তিনি দেশের যেকোনো সরকারি হাসপাতাল থেকে ও সরকার নির্ধারিত বেসরকারি হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারবেন।
.জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় আহত ব্যক্তিদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে সরকার। সবচেয়ে মারাত্মকভাবে বা অতি গুরুতর আহত ব্যক্তিরা ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত। তাঁদের আঘাত সারা জীবনের জন্য প্রতিবন্ধিতা ডেকে এনেছে। যেমন চোখ নষ্ট হওয়া, হাত-পা কাটা পড়া বা শরীরের কোনো বড় অঙ্গের স্থায়ী অকার্যকারিতা।
‘ক’ শ্রেণিভুক্ত আহত ব্যক্তিরা প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে ভাতা পান। এ ছাড়া তাঁদের এককালীন ৫ লাখ টাকা টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। তাঁদের সংখ্যা ৯৯০।
এরপর আছেন ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত আহত ব্যক্তিরা। তাঁরা গুরুতর আহত হয়েছেন, কিন্তু ‘ক’ শ্রেণির মতো স্থায়ী বা সম্পূর্ণ প্রতিবন্ধিতার শিকার হননি। তাঁদের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি এবং সেরে উঠতে অনেক সময় লাগছে। উত্তরার মো. রকিব উদ্দিন জানান, তিনি ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত আহত। তাঁরা প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা করে ভাতা পান। এ ছাড়া তাঁদের এককালীন ৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। তাঁদের সংখ্যা ১ হাজার ৪১৭।
আর আছেন ‘গ’ শ্রেণিভুক্ত আহত ব্যক্তিরা। তাঁরা সাধারণ বা মাঝারি ধরনের আহত হয়েছেন। তাঁদের আঘাতের ধরন তুলনামূলক কম মারাত্মক। তাঁরা প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে ভাতা পান। এ ছাড়া তাঁদের এককালীন ১ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সংখ্যায় ১১ হাজার ৯৬৩।
.কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা সবাই থ্যাইল্যেন্ডে আছেন। তাঁরা প্রায় সবাই গুলিতে আহত হয়েছিলেন। তাঁরা অর্থোপেডিক চিকিৎসা নিচ্ছেন। ১৫ মার্চ পর্যন্ত সরকার তাঁদের জন্য খরচ করেছে ৩৪৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯৯ হাজার ২০৭ টাকা।.
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন থেকে বিভিন্ন ধরনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ছোট–বড় দল বাংলাদেশে আসে। তারা পঙ্গু হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতাল, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থাকা আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় পরামর্শ দেন, কখনো কখনো চিকিৎসায় অংশ নেন। তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেকেরই বিদেশ যাওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এ পর্যন্ত গুরুতর আহত ১৫৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, রাশিয়া ও তুরস্কে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১০৫ জন দেশে ফেরত এসেছেন। এখনো ৩৯ জন বিদেশে আছেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা সবাই থ্যাইল্যেন্ডে আছেন। তাঁরা প্রায় সবাই গুলিতে আহত হয়েছিলেন। তাঁরা অর্থোপেডিক চিকিৎসা নিচ্ছেন। ১৫ মার্চ পর্যন্ত সরকার তাঁদের জন্য খরচ করেছে ৩৪৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯৯ হাজার ২০৭ টাকা।
.জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলতরত মানুষকে ছত্রভঙ্গ করার সময় পুলিশ নির্বিচার ছররা গুলি ব্যবহার করেছিল। চোখেমুখে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছররা গুলি নিয়ে বহু মানুষ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন।
এখন সরকারি হিসাব বলছে, ওই সময় ৫০২ জন চোখে আঘাত পান। তাঁদের মধ্যে ২৮ জন স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। ১০০ জন (এক–দুজন কমবেশি হতে পারে) এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন। অন্যরা চোখের নানা সমস্যায় ভুগছেন।
আন্দোলনের সময় গুরুতর আহত বা বিলম্বে চিকিৎসার কারণে বেশ কিছু মানুষের হাত বা পা কেটে ফেলতে হয়। এ ধরনের আহত ব্যক্তিদের কৃত্রিম পা ও হাত সংযোজন করে ব্র্যাক লিম্ব সেন্টার। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এই সেন্টার পরিচালিত হয় ব্র্যাক ও ব্র্যাক ব্যাংকের সহায়তায়।
ব্র্যাক লিম্ব সেন্টারের পরিচালক মো. শাহিনুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁরা এ পর্যন্ত ৩৪ জনকে কৃত্রিম পা, ৫ জনকে কৃত্রিম হাত দিয়েছেন। এ ছাড়া ৬৮ জনকে ব্রেস বা শারীরিক সহায়ক উপকরণ দিয়েছেন। ১৪৭ জনকে সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলিং করা হয়েছে। ওই সেন্টার থেকে ৬০ জন নিয়মিত ফিজিওথেরাপি পান।
.দু–একটি সরকারি হাসপাতাল বাদ দিলে সাধারণভাবে দেশের হাসপাতালগুলো জরুরি চিকিৎসাসেবায় পিছিয়ে। অল্প সময়ে একসঙ্গে বেশি রোগী ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা প্রায় কোনোটির নেই। রাস্তার আহত রোগীর দায়িত্ব ছোট–বড় কোনো বেসরকারি হাসপাতালে নেয় না। বরাবরের মতো জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের সময় কারও প্রস্তুতি বা বাড়তি উদ্যোগ ছিল না।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় মুক্তকণ্ঠের সাংবাদিকেরা রাজধানীর সরকারি–বেসরকারি ৩৮টি হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা পরিস্থিতি ঘুরে দেখেছিলেন। দেখা গেছে, আহত ব্যক্তিরা ঠিক সময়ে ঠিক চিকিৎসা পাননি। হাসপাতাল, বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক আহত ব্যক্তিদের ভর্তি করাতে অনীহা প্রকাশ করে। অনেক আহত ব্যক্তি গ্রেপ্তারের ভয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাই নিতে যাননি। একসঙ্গে বহু মানুষের চিকিৎসার খরচ কে মেটাবে—এ ভয়ে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রোগী ভর্তি করায়নি। অনেক হাসপাতালের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপও ছিল।
ওই সময় হাসপাতালগুলোয় কী ঘটেছিল, তা নিয়ে অনুসন্ধান করেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি), এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারলিনা বিশ্ববিদ্যালয়, সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়াটারএইড এশিয়া রিজিওন, আন্তর্জাতিক সংস্থা আইপাসের গবেষকেরা। গবেষক দলে মুক্তকণ্ঠের একজন ও সুইডিস দূতাবাসের একজন প্রতিনিধি ছিলেন। তাঁদের গবেষণা প্রবন্ধ গত বছর প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ।
.গবেষণায় দেখা যায়, পুলিশের ভয় বা মামলার ভয়, যানবাহনের অভাব বা রাস্তায় প্রতিবন্ধকতার কারণে আহত অনেক ব্যক্তির পক্ষে হাসপাতালে পৌঁছানো কঠিন ছিল, আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে হাসপাতালে যাওয়ার সঙ্গীর অভাব, রোগী ভর্তি করাতে কিছু প্রতিষ্ঠান অস্বীকৃতি জানিয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান রোগী ভর্তিতে বিলম্ব ঘটায়, অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে বিলম্ব হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা ছিল অপর্যাপ্ত, অনেক ক্ষেত্রে রেফারেল ব্যবস্থা ঠিক ছিল না, কিছু হাসপাতালে রোগীর ব্যাপক চাপ ছিল, রোগীর ভিড়ে কিছু হাসপাতাল চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, অনেক হাসপাতালে রোগীর নাম–ঠিকানা ঠিক মতো রাখা হয়নি, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার নীতি লঙ্ঘিত হয় (বেদনানাশক ব্যবহার না করেই অস্ত্রোপচার), চিকিৎসার জন্য ঘুষ দিতে হয়, সুস্থ হওয়ার আগে বা জোর করে হাসপাতাল ছাড়তে বলা হয়, বেসরকারি হাসপাতালে মর্গের ঘাটতি, সরকারি হাসপাতালে মর্গে জায়গার কমতি, পুলিশি হস্তক্ষেপ, মৃতদেহ হস্তান্তরের সময় হয়রানি, অনেক ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত করা হয়নি, কিছু ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের সময় বিলম্ব হয়, মৃত্যুর তথ্য ঠিকভাবে রাখা হয়নি, ওষুধের ঘাটতি ছিল, জনবলের ঘাটতি ছিল, নীতিনির্ধারক ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। আর ছিল রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।
গবেষক দলের অন্যতম সদস্য ও এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী প্রধান শামীম হায়দার তালুকদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মধ্য জুলাই থেকেই রাজধানীর উত্তরা, বাড্ডা, রামপুরা, মিরপুর, শনির আখড়া, মোহাম্মদপুর, সায়েদাবাদসহ বহু জায়গায় এবং দেশের অন্যান্য বড় শহরে মানুষ আহত হন। তখনো ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। আহত ব্যক্তিরা অনেকে হাসপাতালে যাননি ভয়ে। অনেকে চিকিৎসা নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। অনেকে সরকার পতনের পর চিকিৎসা নিতে আসেন। এসব যদি না হতো, চিকিৎসকেরা সবাই যদি মানবিক দায়িত্ব পালন করতেন, তবে মৃত্যু কম হতো। আহত ব্যক্তিদের জটিলতাও এই পর্যায়ে যেত না।






