ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে রাতভর বিমান হামলা ও বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গতকাল বুধবার রাতভর দেশটির দক্ষিণ উপকূল ঘেঁষে একাধিক কৌশলগত স্থানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র—এমন খবর পাওয়া গেছে। হরমুজ প্রণালিতেও পরপর বিস্ফোরণের কথা বলা হয়েছে।
এদিকে গত কয়েক দিনের মার্কিন হামলায় ইরানে অন্তত ৩৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, খোররামাবাদের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরে অন্তত দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। রাজধানী তেহরান থেকে এটি প্রায় ৪৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ–পশ্চিমে অবস্থিত। হামলার প্রেক্ষাপটে তেহরানে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে বড় দ্বীপ কেশমে একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। বিস্ফোরণ হয়েছে বন্দর আব্বাস নগরীতে। হরমুজ প্রণালির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী সিরিকেও হামলা হয়েছে। ইরানের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের সিস্তান প্রদেশের বন্দরনগরী চাবাহার, কোনারাক এবং রাস্ক থেকেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের ওপর অবরোধ কার্যকরে ২০ যুদ্ধজাহাজ এবং কয়েক শ উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র—এমন উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনে।
দক্ষিণ–পশ্চিমের আন্দিমেস্ক শহরের আকাশে ‘শত্রুপক্ষের’ এমকিউ–৯ ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। দেশটির তাসনিম সংবাদ সংস্থা এ তথ্য জানিয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সর্বশেষ দফার হামলা সম্পন্ন হয়েছে। সেন্টকমের বক্তব্য অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনী বন্দর আব্বাসসহ বিভিন্ন স্থানে ইরানের কমান্ড সেন্টার, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র–ড্রোন সক্ষমতা ও উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, ৯০ মিনিটের এক অভিযানে গ্রেটার টুনব দ্বীপের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোয় হামলা চালিয়েছে সেন্টকম।
গত কয়েক দিন ধরেই ইরানে লাগাতার হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। হামলায় দেশটিতে অন্তত ৩৫ জন নিহত এবং তিন শতাধিক লোকের আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যুক্তরাষ্ট্রের গত কয়েক দিনের হামলার জবাবে উপসাগরীয় দেশগুলোয় বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বাহরাইন ও কুয়েতে বিমান হামলার সতর্ক সাইরেন বাজানো হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে একের পর এক পাল্টা আঘাত হানছে ইরান। জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বিধিনিষেধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামও বেড়ে গেছে—এমন তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে।
‘যুদ্ধ বন্ধে দুপক্ষের সমঝোতা স্মারক সই হলেও’ ইরানে ৭ জুলাই নতুন করে হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র—এমন বক্তব্য উঠে এসেছে বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে। নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর কথা ১০ জুলাই মার্কিন কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই ট্রাম্প প্রশাসন ৬০ দিন ইরানে হামলা চালিয়ে যেতে পারবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সই হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধে ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের। হামলা আর পাল্টা হামলা চলতে থাকলেও ইরানের সঙ্গে এখনো একটি ‘চুক্তি হওয়া সম্ভব’ বলে জানিয়ে রেখেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প—এমন কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ‘যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসনকারী, যুদ্ধাপরাধ করেছে’—জাতিসংঘ মহাসচিবকে ইরানের চিঠি দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে এসেছে।