ভারতে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) হাজারো সমর্থক গত জুন মাস থেকে টানা বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান এই আন্দোলনকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই ঘটনা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতিরই একটি বহিঃপ্রকাশ। তাঁদের মতে, এই দুর্নীতি এবং বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যু গত দেড় দশকে বারবার সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে।
গত ১৫ বছরে দুর্নীতি ও বিভিন্ন অপরাধসহ নানা বিষয় কেন্দ্র করে ভারতে বেশ কিছু বড় গণবিক্ষোভ সংঘটিত হয়েছে, যা রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
দুর্নীতিবিরোধী আইন প্রণয়নের দাবিতে অধিকারকর্মী আন্না হাজারে দুটি অনশন কর্মসূচি পালন করেন, যার প্রথমটি শুরু হয়েছিল ২০১১ সালের এপ্রিলে। তাঁর সমর্থনে দেশজুড়ে লাখ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। সে সময় ক্ষমতাসীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সরকার তাঁকে স্বল্প সময়ের জন্য কারাবন্দী করে। পরবর্তীতে ভারতের পার্লামেন্ট একটি দুর্নীতিবিরোধী আইন পাস করলেও আন্না হাজারের অভিযোগ ছিল, আইনটি তাঁর মূল দাবিগুলো অনেকটাই খর্ব করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০১২ সালে তাঁর কয়েকজন সমর্থক আম আদমি পার্টি (এএপি) গঠন করেন, যা বর্তমানে পার্লামেন্টে মোদি সরকারের অন্যতম বিরোধী দল।
নয়াদিল্লিতে এক তরুণীকে চলন্ত বাসে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র জনরোষ তৈরি হয় এবং রাজধানীতে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করেন এবং পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। তাঁদের দাবি ছিল, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে ব্যর্থ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও সমাজকাঠামোর আমূল সংস্কার এবং অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড। ঘটনার কয়েক দিন পর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে ২৩ বছর বয়সী ভুক্তভোগী তরুণীর মৃত্যু হয়। এর ফলে ভারত সরকার যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞা বিস্তৃত করে আইনে সংশোধন আনে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে।
ভারতের পার্লামেন্টে পাস হওয়া নতুন নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে লাখো মানুষ রাজপথে নামেন। এই আন্দোলনের সময় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ৭৬ জন নিহত হন। এই নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইনের লক্ষ্য ছিল ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু, পারসি, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন ও খ্রিষ্টানদের দ্রুত নাগরিকত্ব প্রদান করা। তবে সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের (এনআরসি) পাশাপাশি এই আইনটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক এবং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের পরিপন্থী। অনেকের আশঙ্কা ছিল, প্রয়োজনীয় নথিপত্র না থাকায় সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর মুসলমানদের নাগরিকত্ব বাতিল হতে পারে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ভারত সরকার আইনটি কার্যকর করে।
নতুন কৃষি আইনের প্রতিবাদে হাজারো কৃষক ভারতের সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। কৃষকদের আশঙ্কা ছিল, এই আইন কার্যকর হলে সরকার ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে শস্য কেনা বন্ধ করে দেবে, ফলে তাঁদের বেসরকারি ক্রেতাদের ওপর নির্ভর করতে হবে। যদিও মোদি সরকার দাবি করেছিল, এই আইন কৃষি খাতকে পুরোনো নিয়ম থেকে মুক্ত করবে এবং কৃষকরা সরাসরি বড় খুচরা বিক্রেতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের কাছে ফসল বিক্রি করতে পারবেন। তবে এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত সরকার এই আইন প্রত্যাহার করে নেয়।
ভারতীয় সেনাবাহিনীতে তরুণ সদস্য নিয়োগ এবং পেনশন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নিয়োগব্যবস্থায় পরিবর্তনের ঘোষণা দেয় সরকার। এর প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং বিভিন্ন স্থানে রেলপথ অবরোধ করা হয়। নিয়োগপ্রত্যাশী, সাবেক সেনাসদস্য ও বিরোধী নেতারা চার বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরোধিতা করেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, চাকরির মেয়াদ শেষে বিকল্প কর্মসংস্থান পাওয়া কঠিন হবে। মোদি সরকার নিয়োগব্যবস্থার পরিবর্তন প্রত্যাহার না করলেও চার বছর দায়িত্ব পালনকারীদের জন্য সরকারি চাকরির ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষণের ঘোষণা দেয়।
কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতালে প্রশিক্ষণরত এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর হাজারো চিকিৎসক রাজপথে নেমে আসেন এবং মাসের পর মাস বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল, কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং ওই নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা।