২০২৫ সালের বিদেশি বিনিয়োগের ইতিবাচক পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে এটি শেষ কথা নয়; বরং একটি সুযোগের ইঙ্গিত। এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশ এই সুযোগকে টেকসই বিনিয়োগের ভিত্তিতে রূপ দিতে পারে কি না। ৭ জুলাই জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬ প্রকাশ করেছে, যেখানে বাংলাদেশের জন্য একটি সুখবর রয়েছে। ২০২৫ সালে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বেড়েছে ৪৫ শতাংশ। টানা দুই বছর পতনের পর এটি ছিল উল্লেখযোগ্য ঘুরে দাঁড়ানো। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রবৃদ্ধির হারও ছিল সর্বোচ্চ। কিন্তু এই পরিসংখ্যান কি সত্যিই স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে? নাকি সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও বড় বাস্তবতা? বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধুমাত্র একটি বছরের প্রবৃদ্ধি দেখে সিদ্ধান্ত নেন না। তাঁরা দেখেন আগামী পাঁচ বা দশ বছরে একটি দেশে ব্যবসা করা কতটা নিরাপদ এবং বিনিয়োগের পরিবেশ কতটা নির্ভরযোগ্য। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান একই সঙ্গে দুটি বার্তা দিচ্ছে। আগে থেকে থাকা বিনিয়োগকারীরা এখনো আস্থা হারাননি। কিন্তু নতুন বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ এখনো অপেক্ষা করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এখন অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। জনসংখ্যা ১৭ কোটির বেশি। সেই তুলনায় ২০২৫ সালে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে উগান্ডা, ঘানা ও কঙ্গোর মতো তুলনামূলক ছোট অর্থনীতিও সমপরিমাণ বা তার বেশি বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও পাকিস্তান বাংলাদেশকে সামান্য ছাড়িয়ে গেছে। তবে এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি তুলনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে। ওই সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামো ও বিনিয়োগের ধরন এক নয়। তবু একটি বিষয় পরিষ্কার—বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় হলেও এখনো সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে ওঠেনি। তাই আসল প্রশ্ন বিদেশি বিনিয়োগ কেন বেড়েছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার তুলনায় বিনিয়োগ এখনো এত কম কেন? দেশের বিদ্যমান আমলাতন্ত্র উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব নয়। ২০২৫ সালের বিদেশি বিনিয়োগের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে নতুন বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে এসেছে বলে নয়; বরং যারা আগে থেকেই এখানে ব্যবসা করছে, তারা তাদের মুনাফার একটি অংশ আবার বাংলাদেশেই বিনিয়োগ করেছে। এটি ইতিবাচক। কারণ, এতে বোঝা যায় বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা এখনো বাংলাদেশের সম্ভাবনা দেখছেন। কিন্তু এটিকে নতুন বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন বলা যাবে না। যাঁরা এখনো বাংলাদেশে আসেনি, তাঁদের সিদ্ধান্ত বদলেছে—এমন প্রমাণ এই পরিসংখ্যান দেয় না। নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন বাড়ানো, প্রযুক্তি আনা এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে ‘গ্রিনফিল্ড’ বিনিয়োগ। কিন্তু এই ধরনের বিনিয়োগ এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। জিডিপির তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ এখনো শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের নিচে, যা বাংলাদেশের মতো বিকাশমান অর্থনীতির জন্য খুবই কম। অর্থাৎ সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান একই সঙ্গে দুটি বার্তা দিচ্ছে। আগে থেকে থাকা বিনিয়োগকারীরা এখনো আস্থা হারাননি। কিন্তু নতুন বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ এখনো অপেক্ষা করছে। আর সেই অপেক্ষার কারণ খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য লাভের পাশাপাশি ঝুঁকিও বিবেচনা করেন। একটি দেশের নীতির ধারাবাহিকতা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো এবং ব্যবসার পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়েই তাঁদের সিদ্ধান্ত তৈরি হয়। বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যাটি কোনো একক দুর্বলতার নয়; বরং কয়েকটি সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত প্রভাব। প্রথমত, নীতির ধারাবাহিকতা ও প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা। বিনিয়োগকারীরা অতিরিক্ত সুবিধার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন স্থিতিশীল নিয়মকানুনকে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন ও আর্থিক অনিশ্চয়তা শুধু ঋণপ্রবাহকেই বাধাগ্রস্ত করে না, পুরো বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে। তৃতীয়ত ব্যবসার পরিবেশ। এখন কেবল সস্তা শ্রমই যথেষ্ট নয়; নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, দক্ষ বন্দর, উন্নত পরিবহন, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা এবং নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো—এসবই এখন বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রধান শর্ত। আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। গত পাঁচ বছরে বিদেশি বিনিয়োগের তুলনায় বৈদেশিক ঋণ অনেক দ্রুত বেড়েছে। ঋণ পরিশোধ করতেই হয়, কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ ঝুঁকি ভাগাভাগি করে। এসব কারণে অনেক বিনিয়োগকারী বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় মনে করলেও, এখনো কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে দেখেন। ফলে বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান বাধা কোনো একটি সমস্যা নয়; বরং সমস্যাগুলোর সম্মিলিত প্রভাব। বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের দৃষ্টি যায় বহুজাতিক কোম্পানির দিকে। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী বিদেশিরা নন; দেশের উদ্যোক্তারাই। জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে বেসরকারি দেশীয় বিনিয়োগ থেকে। অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগ জিডিপির শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের কম। অর্থাৎ অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি এখনো দেশীয় বিনিয়োগ। সাম্প্রতিক বছরগুলোর চিত্রও সেই বার্তাই দিচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগের হার অনেকটা স্থির হয়ে আছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর অর্থ শুধু অর্থনীতির গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে, তা নয়; বরং অনেক উদ্যোক্তা এখন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে আগের মতো আত্মবিশ্বাসী নন। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে কর্মসংস্থানে। সামগ্রিক বেকারত্বের হার বাড়ছে, বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক। প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বের হচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের উপযোগী নতুন কর্মসংস্থান সেই হারে তৈরি হচ্ছে না। তাই শুধু বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বললে হবে না। তার আগে ফিরিয়ে আনতে হবে দেশীয় উদ্যোক্তাদের আস্থা। কারণ, দেশের উদ্যোক্তারা যখন নতুন বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন, সেটিই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও সবচেয়ে শক্তিশালী ইতিবাচক বার্তা হবে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ সংকট যদি মূলত আস্থার সংকট হয়, তাহলে সমাধানও শুধু নতুন প্রণোদনা ঘোষণা বা বিদেশে বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন নয়। বিনিয়োগকারীরা প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব পরিবর্তনকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি তিনটি বিষয়ে নজর দেওয়া। প্রথমত, বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত, অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আস্থা এক দিনে ফিরে আসে না। একটি ভালো অর্থনৈতিক সূচক বা নতুন কোনো ঘোষণা দিয়ে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়া যায় না। তাই বাংলাদেশের আসল চ্যালেঞ্জ শুধু আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আনা নয়; দেশীয় ও বিদেশি—উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা।