মহাবিশ্বের নক্ষত্র কোটি কোটি বছর ধরে যে প্রক্রিয়ায় আলো ও শক্তি উৎপাদন করে, তাকে নিউক্লিয়ার ফিউশন বলা হয়। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে পৃথিবীতে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করছেন, যাতে অফুরন্ত শক্তির উৎস সৃষ্টি করা যায়। সম্প্রতি, কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে ফিউশন জ্বালানি তৈরির সহায়ক উপাদানের ৯টি আণবিক বিন্যাস শনাক্ত করা হয়েছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদনের প্রধান বাধা হলো জ্বালানির অভাব। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোয়ান্টামকেন্দ্রিক সুপারকম্পিউটার ব্যবহার করে এই ফিউশন জ্বালানি তৈরির জন্য সহায়ক উপাদান শনাক্ত করা হয়েছে। অধিকাংশ ফিউশন রিঅ্যাক্টর, বিশেষ করে ডোনাট আকৃতির টোকামাক রিঅ্যাক্টর, ট্রিটিয়াম ও ডিউটেরিয়ামের ফিউশন প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করে। ট্রিটিয়াম একটি তেজস্ক্রিয় উপাদান এবং ডিউটেরিয়াম একটি স্থিতিশীল উপাদান। এই দুই আইসোটোপের ফিউশন বিক্রিয়া থেকে একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াস, একটি মুক্ত নিউট্রন এবং ১৭.৬ মেগা ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তি উৎপন্ন হয়।

তবে, পৃথিবীতে ট্রিটিয়ামের প্রাকৃতিক অস্তিত্ব খুবই কম। এটি কেবল বায়ুমণ্ডলে মহাজাগতিক রশ্মির মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে সামান্য পরিমাণে তৈরি হয়। যদি বিজ্ঞানীরা কৃত্রিমভাবে ট্রিটিয়াম উৎপাদনের কার্যকর উপায় খুঁজে পান, তবে ফিউশন শক্তি একটি বাস্তব ও নির্ভরযোগ্য উৎসে পরিণত হতে পারে। ফিউশন শক্তির সমর্থকেরা একে পরিবেশবান্ধব শক্তির উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন, কারণ এটি জীবাশ্ম জ্বালানির মতো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে না এবং প্রচলিত নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়ার তুলনায় অনেক কম তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি করে।

২০২২ সালের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা ফিউশন বিক্রিয়ায় প্রথমবারের মতো সাফল্য অর্জন করেন। তারা বিক্রিয়া শুরু করতে যে পরিমাণ শক্তি ব্যবহার করেছিলেন, তার চেয়ে বেশি শক্তি উৎপাদন করতে সক্ষম হন। সম্প্রতি, ফিউশন বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উত্তপ্ত প্লাজমা ১ হাজার ৩৩৭ সেকেন্ড ধরে রাখার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বিজ্ঞানীদের প্রধান কাজ হলো ট্রিটিয়ামের সংকট সমাধান করা। এই লক্ষ্যে ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি, আইবিএম টি জে ওয়াটসন রিসার্চ সেন্টার ও মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা যৌথভাবে সুপারকম্পিউটারের সাহায্য নিচ্ছেন।

ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির কম্পিউটেশনাল কেমিস্ট টম বেক জানান, "ফিউশন রিঅ্যাক্টরের জ্বালানি হিসেবে পর্যাপ্ত ট্রিটিয়াম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতি আবিষ্কার এবং নকশার চক্রকে ত্বরান্বিত করতে কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।" এই শক্তিশালী কম্পিউটারগুলো এফএলআইবিই নামের একটি তরল লবণের ৯টি ভিন্ন আণবিক বিন্যাস বের করেছে, যা ট্রিটিয়াম উৎপাদনের জন্য খুবই কার্যকর।

বর্তমানে সুপারকম্পিউটারগুলো কেবল ভার্চ্যুয়াল সিমুলেশন সম্পন্ন করেছে। এই বিন্যাসগুলো এখন গবেষণাগারে পরীক্ষা করতে হবে। গবেষকেরা এফএলআইবিইর ইলেকট্রনিক গঠন, পারমাণবিক আচরণ এবং প্রতিটি বিন্যাস থেকে তৈরি হতে যাওয়া ট্রিটিয়ামের ভেতরের আণবিক বন্ধনের শক্তি সম্পর্কে একটি নিখুঁত ধারণা পেয়েছেন। আইবিএমের এক্সপেরিমেন্টাল কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বিজ্ঞানী জেরি চো জানান, "এই ফলাফল প্রমাণ করে, কোয়ান্টামকেন্দ্রিক সুপারকম্পিউটিং এখন রসায়নবিদ, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জিং সমস্যাগুলো সমাধানের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।"