দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, এই সংসদ যদি দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষক না হয়, তবে বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি বিদায় নেবে। আজ বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে তিনি এই কথাগুলো বলেন।
জামায়াতে ইসলামীর এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষক যদি এই সংসদ না হয়, আমি পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি কানে ধরে বিদায় নেবে; কিন্তু আমাদের যদি আশ্রয়–প্রশ্রয় থাকে, পছন্দ-অপছন্দ এগুলা যদি ক্রিয়াশীল থাকে, দুর্নীতি বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেওয়ার কোনো কারণ নেই। কেউ দায় দেন আমলাদের, কেউ দায় দেন ব্যবসায়ীদের, কেউ দায় দেন রাজনীতিবিদদের। আমি বলি দায় আমাদের সবার।’
অর্থমন্ত্রীর আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর অগ্রাধিকারের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় শফিকুর রহমান বলেন, এর প্রতিফলন সংসদ থেকে শুরু করে সর্বত্র দেখতে চান তিনি। বিশেষ করে ব্যাংক-বিমা ও স্টক মার্কেটে যেন শৃঙ্খলা ফিরে আসে। তাঁর মতে, আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলার মূল কারণ দুর্নীতি। তিনি উল্লেখ করেন, সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো একক খাতের দুর্নীতি নির্মূল করা অসম্ভব।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরার কথা বলেছেন। আপাতত দুর্নীতির হাত চেপে ধরে কড়া লাগানো প্রয়োজন। এই প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে যদি এই দুর্নীতির সাথে আমিও জড়িত থাকি, ছাড় দেওয়া উচিত নয়।’
উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে সুষম বণ্টনের দাবি জানিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি ইনসাফ করা হয়নি। সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের বড় অঙ্কের ফান্ড দেওয়া হলেও বিরোধী দলের কেউ তা পাননি। তিনি বলেন, ‘বিএনপির ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারে সুষম উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সেই সুষম বণ্টনটাই সবাই প্রত্যাশা করে। রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে যেন সাধারণ জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।’
এছাড়া বিরোধী দলের আসনে সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের দায়িত্ব প্রদান এবং এ নিয়ে মন্ত্রীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের বিষয়ে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চান তিনি। সরকারি অর্থ অপচয় করে স্থাপনায় ব্যক্তিগত নামফলক বসানোর সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, পটপরিবর্তনের সাথে সাথে কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করে নামফলক পরিবর্তনের অপরাজনীতি দেশের জন্য ক্ষতিকর। যার নামের মোহ আছে, তিনি নিজের টাকা ও জমিতে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে নাম দিতে পারেন।
সংসদকে ‘মজলুমের মিলনমেলা’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, সংসদের কার্যক্রম যত নিয়মতান্ত্রিক হবে, মানুষের হতাশা তত দূর হবে। তবে সম্প্রতি পাস হওয়া একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিলের ক্ষেত্রে বিরোধী দল বিস্তারিত আলোচনা ও অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা, ভূমিধস ও পানিতে ডুবে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।’ বিশেষ করে চট্টগ্রামের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও নাজুক পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা করে তিনি ঢাকাকে দেশের ‘চেহারা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বিদেশি অতিথিদের ধারণার কথা উল্লেখ করে তিনি ঢাকাকে দৃষ্টিনন্দন করতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের গুরুত্বারোপ করেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের প্রশংসা করে বিরোধীদলীয় নেতা প্রাথমিক স্তরে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি মনে করেন, ধর্ম মানুষকে শালীনতা, দেশপ্রেম ও সততা শেখায়, যা সব ধর্মের শিক্ষার্থীদের জন্যই প্রযোজ্য। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ এবং স্বতন্ত্র মাদ্রাসাগুলোর উন্নয়নে নজর দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার সংস্কৃতি বন্ধ করে যোগ্যতার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করার অনুরোধ জানান তিনি।






