কোনো আলোচনা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে ‘ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ বিল’। বুধবার বিলটি উত্থাপনের পরপরই তা পাস করা হয়। বিলটি পরীক্ষার জন্য স্থায়ী কমিটিতে না পাঠানো এবং সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত পাস করার তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধী দল। তবে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, বিলটি পাস হলেও পরবর্তীতে বিরোধী দলের সংশোধনী প্রস্তাবগুলো যৌক্তিক হলে তা গ্রহণ করা হবে। আজ সংসদ অধিবেশন শেষ হওয়ার কারণে দ্রুত বিলটি পাস করতে হয়েছে বলে জানানো হয়।

সংসদের আজকের নির্ধারিত কার্যসূচিতে আইন প্রণয়নের বিষয়টি ছিল না; সম্পূরক কার্যসূচিতে এটি যুক্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করেন। সাধারণত বিল উত্থাপনের তিন দিন আগে সদস্যদের নোটিশ দিতে হয় এবং এরপর তা স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সরাসরি পাসের প্রস্তাব করতে পারেন। বিল উত্থাপনের আগে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল নোটিশের সময়ের বিষয়টি কন্ডন বা মার্জনা করেন।

বিলটি উত্থাপনের প্রস্তাবের পর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, "এই আইনের মাধ্যমে ছয়টি পূর্ববর্তী আইনকে রহিত করা হচ্ছে। দুটি প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করা হচ্ছে।"

স্পিকারের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, তাঁরা আজ বিলের কপি পেয়েছেন এবং তিন দিনের বিষয়টি স্পিকার মার্জনা করেছেন। তবে ৯ জুলাই মন্ত্রিসভায় আইনটি পাস হওয়া সত্ত্বেও কেন সদস্যদের নোটিশ বা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট দেওয়া হয়নি এবং কমিটিতে না পাঠিয়ে সরাসরি পাস করার তাড়াহুড়া কেন, তার কোনো জাস্টিফিকেশন তাঁরা পাননি। নাজিবুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, "এখানে কোনো স্বার্থ জড়িত কি না" এবং বিলটি স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণের প্রস্তাব করেন।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণের প্রথা সপ্তম সংসদ থেকে শুরু হয়েছে। এটি কোনো নতুন আইন নয়, বরং বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাজের ‘ওভারল্যাপিং’ দূর করতে সেগুলোকে একটি কর্তৃপক্ষের অধীনে একীভূত করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বিলটি আরও আগে আনতে পারলে খুশি হতেন, কিন্তু আজ অধিবেশন শেষ হবে। জটিল কোনো বিষয় থাকলে তিনি নিজেই স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করতেন। আইন পাসে তিনি বিরোধী দলের সহযোগিতা চান।

এর পরিপ্রেক্ষিতে নাজিবুর রহমান ডেপুটি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, "কোনো সময় না দিয়ে এভাবে তাড়াহুড়া করে আপনারা যদি বিল পাস করার অনুমতি দেন, তাহলে আমি মনে করি, আমাদের যে মৌলিক অধিকার আইন প্রণেতা হিসেবে, সেটা আমাদের ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং এটা বারবার হচ্ছে।"

তবে তাঁর আপত্তি নাকচ করে কণ্ঠভোটে বিলটি উত্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয় এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তা অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব করেন। এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ কয়েকটি ধারায় সংশোধনীর কথা জানালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডেপুটি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, "মাননীয় সদস্য যে ধারাগুলোতে সংশোধনের কথা বলছেন, এখন বিধি মোতাবেক যেহেতু আপনি সবকিছু কন্ডন করেছেন, তাঁরটাও কন্ডন করে মৌখিকভাবে উত্থাপনের অনুমতি দিতে পারেন। আমরা নোট করব এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে যদি কোনো সংশোধনী গ্রহণ করার থাকে তাহলে পরে আমরা সেটা গ্রহণ করব, যদি সেটা যুক্তিযুক্ত হয়।"

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, "এই অধিবেশনের আজকের শেষ দিন। আমরা চাই যে আমাদের এই দিনটা এই অধিবেশনের যেন গ্লোরিফাই হয়ে থাকুক। এখানে প্রথম অধিবেশনে বেশ কিছু আইন খুব তড়িঘড়ি করে পাস করতে হয়েছে সময়ের বাধ্যবাধকতার কারণে। সেই সময় আমরা বলেছিলাম, ভবিষ্যতে যেন সবকিছু আমাদের কাছে আমাদের প্রাপ্যতা অনুযায়ী আসে। এখানে শুধু অধিকারের প্রশ্ন নয়, এটা দায়িত্বেরও ব্যাপার। আমরা অধিকার না হয় স্যাক্রিফাইস করলাম; কিন্তু দায়িত্বে আমাদের অবহেলা হয়ে গেল।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন, তাড়াহুড়া করে বিষয়গুলো মানিয়ে নিতে গিয়ে অনেক অধিকার ও দায়িত্ব লঙ্ঘিত হচ্ছে, যা সংসদের জন্য ভালো প্রেসিডেন্স হবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতার কথাকে ‘রাইটলি পয়েন্ট আউট’ বলে সদস্যদের সংশোধনী যৌক্তিক হলে তা গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দেন। ডেপুটি স্পিকারও আশা প্রকাশ করেন যে, মন্ত্রী তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।

পাস হওয়া এই বিলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিলুপ্ত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইনও রহিত করা হয়েছে। সংবিধিবদ্ধ এই কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় হবে ঢাকায় এবং একজন চেয়ারম্যান ও সাতজন সদস্য এর দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হবেন প্রধান নির্বাহী। এছাড়া সরকারের অনুমোদন নিয়ে দেশে বা বিদেশে শাখা কার্যালয় ও লিয়াজোঁ অফিস স্থাপন করা যাবে।